ক্যানসারে থামল জাতীয় দলের স্বপ্ন: ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা গেলেন ফেনীর তরুণ ক্রিকেটার হৃদয়
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার স্বপ্ন বুকে নিয়ে লড়ছিলেন ফেনীর তরুণ ক্রিকেটার মেহেদী হাসান হৃদয়। চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ দলে খেলা এই ক্রিকেটারের সেই স্বপ্ন থেমে গেল ক্যানসারের কাছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা গেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে ফেনীর ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
হৃদয় আক্রান্ত ছিলেন অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) নামের রক্তের ক্যানসারে। চিকিৎসকদের ভাষ্যে, এটি রক্ত ও অস্থিমজ্জার এক ধরনের ক্যানসার। এই রোগ ধরা পড়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি, আর পরিবারের সদস্যরা তাঁর চিকিৎসা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
হৃদয় ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের মধুয়াই গ্রামের আবুল কাশেমের একমাত্র ছেলে। পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন তিনি; তাঁর একটি ছোট বোন রয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটিতে এখন শোকের মাতম চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তরুণ এই ক্রিকেটারের প্রতিভা নজর কেড়েছিল বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে। চট্টগ্রাম বিভাগের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে বড় ক্রিকেটের দরজা খুলে দিচ্ছিল। সতীর্থ ও সংগঠকদের কাছে তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় একজন খেলোয়াড়, যাঁর লক্ষ্য ছিল একদিন জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামা।
অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হৃদয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল ক্রিকেট অঙ্গন ও সরকার। তাঁর চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফেনীর স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকেরাও আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
গত ২ জুলাই বিসিবি কার্যালয়ে হৃদয়ের বাবা আবুল কাশেমের হাতে চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। একই পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেয় বিসিবিও। সব মিলিয়ে দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই পাঁচ লাখ করে টাকা পেয়েছিল পরিবারটি, যা দিয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর চেষ্টা চলছিল।
কিন্তু সব চেষ্টার পরও বাঁচানো যায়নি এই তরুণ ক্রিকেটারকে। শনিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। যে ঢাকা একসময় তাঁর ক্রিকেট-স্বপ্নের কেন্দ্র ছিল, সেই ঢাকার পথেই থেমে গেল তাঁর জীবনের যাত্রা — এই বাস্তবতা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে পরিবার ও ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের।
হৃদয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সংগঠনটির শোকবার্তা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়ায় তরুণ এই খেলোয়াড়ের অকালমৃত্যুকে ক্রিকেটের জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিসিবির ফেনী জেলা কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম অপু বলেন, ‘মেহেদী হাসান হৃদয়ের মৃত্যু জেলা ও দেশের ক্রিকেটের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সে ছিল সম্ভাবনাময় একজন তরুণ ক্রিকেটার। তার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে খেলা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তাকে চলে যেতে হলো। হৃদয়ের এই অকালমৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
ফেনীর স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের অনেকেই হৃদয়ের চিকিৎসায় পাশে ছিলেন। তাঁদের সেই সম্মিলিত চেষ্টা, বিসিবি ও মন্ত্রণালয়ের সহায়তা এবং পরিবারের লড়াই — সবকিছুর পরও ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের কাছে হার মানতে হলো তরুণ এই ক্রিকেটারকে।
হৃদয়ের গল্প আবারও সামনে এনেছে প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসা-সহায়তার প্রশ্নটি। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে যাঁরা দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ হিসেবে গড়ে ওঠেন, অসুস্থ হলে তাঁদের চিকিৎসার ব্যয় পরিবারের একার পক্ষে বহন করা কতটা কঠিন, হৃদয়ের পরিবারের অভিজ্ঞতা সেই চিত্রই তুলে ধরেছে।
আপাতত পরিবার ও ফেনীর ক্রীড়াঙ্গন শোক সামলানোর চেষ্টা করছে। সতীর্থ, সংগঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তরুণ এই ক্রিকেটারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। জাতীয় দলে খেলার অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই বিদায় নিলেন মেহেদী হাসান হৃদয়, তবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তাঁর লড়াই ও প্রতিভার কথা মনে রাখবে ফেনীর ক্রিকেট।



