ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে মডার্নার এমআরএনএ টিকা, শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থাকেই শেখানো হবে ক্যানসার কোষ চিনতে
ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন এক সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ ও টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না। প্রতিষ্ঠানটি এমআরএনএ প্রযুক্তিনির্ভর এমন একটি টিকা তৈরি করছে, যা ক্যানসার শরীরের এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। টিকাটি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে সক্রিয় করে তুলতে পারে — এমনটাই এই গবেষণার মূল ধারণা।
ক্যানসার কেন এত ভয়ংকর হয়ে ওঠে, তার অন্যতম কারণ এই ছড়িয়ে পড়া। ক্যানসার সব সময় শরীরের এক অঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে না; এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘মেটাস্ট্যাসিস’, আর রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করার পেছনে এই ছড়িয়ে পড়াই বড় ভূমিকা রাখে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময়ের সুযোগ থাকে। কিন্তু রোগটি তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে গেলে চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে এবং রোগীর ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়েছে কি না, তা নির্ধারণে চিকিৎসকেরা নানা ধরনের পরীক্ষার আশ্রয় নেন।
ক্যানসার কোষ মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শরীরের অন্য অংশে পৌঁছে সেখানে নতুন টিউমার তৈরি করতে পারে। এই ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কাজ করে কয়েকটি মাধ্যম, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিতটি হলো রক্তপ্রবাহ।
রক্তের মাধ্যমে ছড়ানোর ক্ষেত্রে ক্যানসার কোষ রক্তনালিতে প্রবেশ করে রক্তের সঙ্গে শরীরের অন্য অংশে পৌঁছে যায়। সেখানে অনুকূল পরিবেশ পেলে কোষগুলো আবার বাড়তে শুরু করে এবং নতুন টিউমারের জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় মাধ্যমটি হলো লসিকাতন্ত্র। লসিকানালির সাহায্যেও ক্যানসার কোষ শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতে পারে। এভাবে ফুসফুস, লিভার, মস্তিষ্ক কিংবা হাড়ে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এর বাইরে ক্যানসার কোষ মূল টিউমারের চারপাশের সুস্থ টিস্যুতেও প্রবেশ করে সেখানে বৃদ্ধি পেতে পারে। সেখান থেকে পরে তা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার পথ তৈরি হয়। এই তিন পথের যেকোনো একটি দিয়েই রোগটি ধীরে ধীরে পুরো শরীরে বিস্তার লাভ করতে পারে।
মডার্নার তৈরি টিকাটি দাঁড়িয়ে আছে এমআরএনএ প্রযুক্তির ওপর। এ ধরনের টিকা শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে এক ধরনের নির্দেশনা দেয় — অর্থাৎ প্রতিরোধব্যবস্থা শিখে নেয়, কোন কোষকে আক্রমণ করতে হবে।
এই টিকার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ক্যানসার কোষে থাকা কিছু বিশেষ প্রোটিন বা ‘নিয়োঅ্যান্টিজেন’কে লক্ষ্য করে প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করা। নিয়োঅ্যান্টিজেন হলো ক্যানসার কোষে জিনগত পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া বিশেষ অ্যান্টিজেন; এগুলো শনাক্ত করতে পারলে রোগ প্রতিরোধক কোষ ক্যানসার কোষকে আলাদা করে আক্রমণ করতে পারে।
তবে আশার পাশাপাশি সতর্কতার কথাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। টিকাটি সরাসরি সব ক্যানসার কোষের প্রোটিন ধ্বংস করে দেবে কিংবা ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে — এমনটি মোটেও নিশ্চিত নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফল এবং কোন ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার ওপর।
প্রতিবেদনে টিকাটির তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই পরীক্ষার বর্তমান অবস্থা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বাজারে আসার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য ছাড়া শিগগিরই এটি সাধারণ রোগীদের হাতে পৌঁছাবে — এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে ক্যানসার চিকিৎসায় এমআরএনএ প্রযুক্তির এই গবেষণা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুললেও টিকাটি কতটা কার্যকর ও নিরাপদ, তা নিশ্চিত হতে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। সেই ফল হাতে এলেই বোঝা যাবে, এই টিকা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কত বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।




