হেবরনে আস্ত পাড়া গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েলি বাহিনী, ঘরছাড়া শত শত ফিলিস্তিনি পরিবার
দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে একটি পুরো আবাসিক পাড়া গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শুক্রবার একটি সামরিক তল্লাশিচৌকিতে হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া এই অভিযানে শত শত ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই অভিযানকে ‘সামষ্টিক শাস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
হেবরন পৌরসভার হিসাব অনুযায়ী, শহরের আইন দেইর বাহা এলাকায় প্রায় ৩৫ হেক্টর (৮৬ একর) এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে অথবা ধ্বংসের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত ওই এলাকা থেকে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। প্রায় আড়াই লাখ বাসিন্দার পুরো হেবরন শহরটি সব প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে হেবরন পৌরসভার প্রধান ইউসেফ জুহাইর আল-জাবারি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরায়েলি পরিকল্পনায় আরও প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার কথা রয়েছে।
শুক্রবার হেবরনের বাইরে একটি ইসরায়েলি সামরিক তল্লাশিচৌকিতে দুই বন্দুকধারী হামলা চালান। প্রায় ২০ মিনিটের গোলাগুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত ও তিনজন আহত হন; দুই হামলাকারীও নিহত হন। আইন দেইর বাহা এলাকাটি ওই দুই হামলাকারীর নিজ এলাকা বলে ইসরায়েলি পক্ষের অভিযোগ।
হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওই স্থান পরিদর্শন করে ঘোষণা দেন, ইসরায়েল ‘এই জায়গাটি ধ্বংস করে দেবে’। তিনি পশ্চিম তীর অবরুদ্ধ করার ঘোষণাও দেন। তার সঙ্গে ছিলেন কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, যিনি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে একটি ফিলিস্তিনি ভবন ভাঙার দৃশ্যের সামনে নিজের ভিডিও ধারণ করেন।
স্মোট্রিচ বলেন, হামলাস্থলের পাশে থাকা সারিবদ্ধভাবে বিস্তৃত ‘অবৈধ আরব স্থাপনা’ অবিলম্বে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘গাজা ও লেবাননের মতোই’ পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, হেবরনের প্রবেশপথের তল্লাশিচৌকির কাছাকাছি আল-জালাদা ও আইন দেইর বাহা এলাকায় এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল উগ্রবাদী ও অস্ত্রের সন্ধান করা।
হেবরনের এক বাসিন্দার পাঠানো ভিডিওতে শহরের কয়েকটি ব্লকজুড়ে প্রতিটি বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ধ্বংসচিত্র দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে সেনাদের ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোতে কালো রঙের ক্রস চিহ্ন স্প্রে করতে দেখা যায়; আরেকটিতে বুলডোজার দিয়ে পাহাড়ি ঢালে পাথরের দেয়াল ভাঙতে দেখা যায়। একটি বড় আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি পতাকা টানানো ছিল।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই ভবনটি হেবরনের একটি প্রখ্যাত পরিবারের বাড়ি, যেটি সাময়িক সামরিক সদর দপ্তর হিসেবে দখল করে নেওয়া হয়েছে। পৌরসভার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রায় ৩০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ বন্ধু ও আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন; পৌরসভা অন্যদের জন্য কমিউনিটি হল ও শিশুদের খেলার জায়গা খুলে দিয়েছে।
হেবরনের নাগরিক অধিকারকর্মী ইসা আমরো বলেন, ‘আমরা সামষ্টিক শাস্তি পাচ্ছি এমন কিছুর জন্য, যা আমরা করিনি এবং সমর্থনও করিনি। আমাদের দুর্ভোগকে ইসরায়েলের নির্বাচনের রাজনৈতিক উপকরণে পরিণত করা হচ্ছে, আর মূল্য দিচ্ছে নিরপরাধ পরিবারগুলো।’ তার বোনের পরিবারও উচ্ছেদ হওয়া শত শত পরিবারের একটি।
উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দা মাজদি নাসের বলেন, ‘আমরা কর্মকর্তাদের আমাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি, কারণ এসবের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এখানে শিশুরা রয়েছে। আমরা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই। এসবই সম্পূর্ণ খেয়ালখুশিমতো করা হচ্ছে।’ বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলাকারীদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এমন অনেক মানুষকেও সেনাবাহিনী উচ্ছেদ করেছে।
আল-জাবারি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী হেবরনে দোকানপাট, কারখানা, বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট ধ্বংস করেছে এবং এই পদক্ষেপ ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অযৌক্তিক। তার মতে, এই অভিযানের পেছনে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রভাব রয়েছে; জনমত জরিপ অনুযায়ী, এই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ও তার সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী শুক্রবার ও শনিবার প্রায় ৭০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি। অভিযান ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও নিয়ে মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
আমরো টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা শত শত পরিবারের কথা বলছি, যারা এই ঘটনার কারণে ঘর ছেড়েছে; গতকালের ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। এটি অনেক বড় একটি এলাকা। আমরা জানি না আসলে কী ঘটছে—এটি শুধু নির্বাচনী প্রচার, নাকি নির্বাচনের পরের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে করা গুরুতর কোনো পরিকল্পনা।’ উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞ আরও বিস্তৃত হয় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন হেবরনের বাসিন্দারা।






