জাতিসংঘের খাদ্যসহায়তা অর্ধেকে নামায় পশ্চিম তীরে গভীর হচ্ছে ক্ষুধার সংকট
ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় অনেক পরিবারের সামনে এখন ক্ষুধাই সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটি সেপ্টেম্বরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে খাদ্যসহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তীব্র তহবিল সংকট — আন্তর্জাতিক দাতাদের অর্থায়ন কমে যাওয়ার ফল এটি। অথচ ২০২৩ সালের পর থেকে খাদ্যের চাহিদা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আল জাজিরাকে দেওয়া বিবৃতিতে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, সেপ্টেম্বরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই কিছু পরিবারের সহায়তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তুলকারেমের ৭৫ বছর বয়সী বিধবা ফাওজা আওয়াদ সেই বাস্তুচ্যুতদের একজন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উত্তর পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরগুলো লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি অভিযানে তিনি তুলকারেম শরণার্থী শিবিরের ঘর হারান। ওই অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
টাকার অভাবে ফাওজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে তুলকারেমে তাঁর মেয়ের একটি ছোট অসমাপ্ত বাড়িতে। ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও তাদের সন্তানকে নিয়ে তিনি বাড়িটির একাংশে থাকছেন। আগে তাঁরা ডব্লিউএফপির সীমিত নগদ ও খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু গত পাঁচ মাস ধরে কোনো সহায়তাই পাননি।
ফাওজা জানান, তাঁর পুরোনো বাড়িতে ফেরার সম্ভাবনাও নেই — ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভবনটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক যান চলাচলের জন্য চওড়া রাস্তা বানিয়েছে। তাঁর এক ছেলে ২০২৪ সাল থেকে ইসরায়েলের হাতে আটক, আর আগে ইসরায়েলে কাজ করা অন্য ছেলেরা এখন সবাই বেকার।
হাঁপানি ও উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ফাওজার প্রতি মাসে অন্তত ২০০ শেকেল (প্রায় ৬৪ ডলার) ওষুধের খরচ লাগে, যা কেউ বহন করে না। তাঁর ভাষায়, আগে যে সামান্য খাদ্যসহায়তা পেতেন, তা দুই-তিনজনের জন্যই যথেষ্ট ছিল না; এখন সেটুকুও পুরোপুরি বন্ধ।
তুলকারেমের থান্নাবে এলাকার আল-মুওয়াহহাদ স্কুল ভবনে আশ্রয় নিয়েছে তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় আর যাওয়ার জায়গা না পেয়েই তাঁরা সেখানে রয়েছেন।
তাদের মধ্যে আছেন ৪৭ বছর বয়সী রাবাব কাসিম, তাঁর ৭২ বছর বয়সী স্বামী তালিব আবু সাররিয়া ও তাঁদের তিন সন্তান। টানা দ্বিতীয় বছর তাঁরা স্কুলের নিচতলার মাত্র ৩০ বর্গমিটারের একটি কক্ষে বাস করছেন; কোনো আয়ের উৎস নেই, পুরোপুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ডব্লিউএফপির সহায়তা বন্ধের পর গত তিন মাস ধরে তাঁরা কিছুই পাননি।
রাবাবের মেরুদণ্ডে ডিস্ক সরে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে; প্রতি মাসে ৩০০ শেকেল (প্রায় ৯৬ ডলার) চিকিৎসা খরচ লাগে, যা তাঁর সামর্থ্যের বাইরে। ফিজিওথেরাপিও তিনি কখনো নিতে পারেননি। মেঝেতে জীর্ণ তোশকে ঘুমান তিনি; তাঁর একমাত্র ইচ্ছা একটি খাট কেনা। তালিব জানান, পরিবারটি প্রায়ই রুটি বা এক বেলার খাবার জোগাড় করতে পারে না, অনেক রাত না খেয়েই ঘুমাতে হয়। অথচ তুলকারেম শিবিরে একসময় তাঁর একটি ছোট সবজির দোকান ছিল, তা দিয়েই সংসার চলে যেত।
ডব্লিউএফপির সর্বশেষ ত্রৈমাসিক খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ বলছে, পশ্চিম তীরের ৭৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি পরিবারের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনসংখ্যার ১২ শতাংশের খাদ্যগ্রহণ দুর্বল পর্যায়ে, আর এক-তৃতীয়াংশ পরিবার সুস্থ খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখে না। গ্রামীণ এলাকা ও দক্ষিণ পশ্চিম তীরের গভর্নরেটগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তার খিরবেত আল-রাকিজের বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী সাইদ আল-আমুর ও তাঁর ১৪ সদস্যের পরিবার সাত মাস ধরে ডব্লিউএফপির কোনো সহায়তা পাননি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের বারবার হামলার মুখে তিনি এক বসতি স্থাপনকারীর গুলিতে আহত হন; সেই আঘাতে তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। এখন তাঁর মাসিক চিকিৎসা খরচ অন্তত ১,২০০ শেকেল (প্রায় ৩৮৫ ডলার), যা বহন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। কয়েকটি জলপাই গাছ ছাড়া তাঁর আয়ের কোনো উৎস নেই, সেগুলোও বসতি স্থাপনকারীরা দখলের চেষ্টা করে।
অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ডব্লিউএফপি এখনো পশ্চিম তীরে ২ লাখ ফিলিস্তিনিকে নগদ অর্থ, খাদ্য ভাউচার, সরাসরি খাদ্য, জীবিকা কর্মসূচি ও পুষ্টিসেবার মাধ্যমে সহায়তা দিচ্ছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, সহায়তা প্রয়োজন এমন সব পরিবারের চাহিদা মেটানোর মতো সম্পদ তাদের হাতে নেই।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সহায়তা বন্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ওই পরিবার সহায়তার অযোগ্য; বরং এটি সব বর্তমান উপকারভোগীকে প্রভাবিত করা একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্ত। পরিস্থিতি বদলালে কারও কারও সহায়তা আবার চালু হতে পারে; সেক্ষেত্রে বার্তা পাঠিয়ে তাঁদের জানানো হবে।
অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী উবাই আবুদির মতে, ডব্লিউএফপির সহায়তা হারানোর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক সংকটও মানবিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ২০২৫ সালের মে থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পক্ষে সংগ্রহ করা শুল্ক রাজস্ব পুরোপুরি আটকে রেখেছে, ফলে কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না।
আবুদি আরও বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল কাজের অনুমতি বন্ধ করে দেওয়ায় ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেকার হয়ে আছেন। পাশাপাশি ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার নিবন্ধন স্থগিতসহ ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ মানবিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাকে আরও সীমিত করেছে। তাঁর হিসাব, প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারের খাদ্যসহায়তা দরকার, আর প্রকৃত চাহিদা হয়তো আরও বেশি।




