জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক আর্মেনিয়াই প্রশ্নের মুখে: খনি আর দুর্বল পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে উঠছে আঙুল
বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-এর আয়োজক হয়েও নিজের পরিবেশগত রেকর্ড নিয়েই প্রশ্নের মুখে পড়েছে আর্মেনিয়া। গত সপ্তাহান্তে ইয়েরেভানে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষগুলোর ১৭তম সম্মেলন (কপ১৭) শুরু হয়েছে। কোনো সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এই প্রথম এই সম্মেলনের আয়োজক হলো, আর আর্মেনিয়া সরকার একে নিজেদের পরিবেশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে উদ্যাপন করেছে। কিন্তু দেশটির নিজের পরিবেশ চিত্র সেই দাবির সঙ্গে কতটা মেলে, তা নিয়ে সমালোচনা থামছে না।
২০২৪ সালে কপ১৭ আয়োজনের অধিকার পাওয়ার পর আর্মেনিয়া কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটিকে দেশের পরিবেশগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরেছিল। অথচ কয়েক দশক ধরেই কার্যকর সংরক্ষণ নীতি গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি, এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তার রেকর্ড এখনো দুর্বল।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের পরিবেশ কর্মদক্ষতা সূচকে ১৭৭টি দেশের মধ্যে আর্মেনিয়ার অবস্থান ৭৫তম; একই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আরেক সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এস্তোনিয়া। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আর্মেনিয়ার অবস্থান ১৬৪তম এবং বর্জ্যপানি শোধনে ১৬৫তম — এই সংখ্যাগুলো মৌলিক পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুতর ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
এই বৈপরীত্য থেকেই প্রশ্নটি উঠছে: এত গুরুতর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা একটি দেশকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক করা হলো কেন? বাছাইটি হয়তো পরিবর্তনে উৎসাহ দেওয়ার সুযোগ হতে পারত, কিন্তু আর্মেনিয়া কর্তৃপক্ষ সেই সুযোগে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় এগিয়েছে — এমন ইঙ্গিত খুব কমই মিলেছে।
বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির অর্থনীতির কাঠামো, যেখানে খনি শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; তার সঙ্গে আছে পুরোনো শিল্পকারখানা আর দুর্বল পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ। জাঙ্গেজুর, আগারাক ও তেঘুত তামা-মলিবডেনাম খনির মতো দেশের সবচেয়ে বড় খনিগুলোতে খোলা-গর্ত পদ্ধতিতে আকরিক তোলা হয়, যা বিপুল বর্জ্য তৈরি করে এবং মারাত্মক দূষণের ঝুঁকি ডেকে আনে। বিশ্বব্যাংক খনি শিল্পকে আর্মেনিয়ার পরিবেশ দূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মেঘরাসারে খোলা-গর্ত সোনার খনির লাইসেন্সও দেওয়া হয়েছে এমন জমিতে, যা একসময় আরেভিক জাতীয় উদ্যানের এলাকার ভেতরে পড়েছিল — পরে ২০১৫ সালে সরকার উদ্যানটির সীমানা কমিয়ে দেয়। আর্টসভানিক বর্জ্য জলাধারে জমা রয়েছে লাখ লাখ টন খনি বর্জ্য, আর এর সঙ্গে কাছের জলপ্রবাহে ভারী ধাতুর দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
আর্মেনিয়ার পরিবেশ সমস্যা খনিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ এলাকা বনভূমি। রাজধানী ইয়েরেভানে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণার বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সীমার প্রায় পাঁচ গুণ।
দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর নির্ভরতাও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পথে আরেক জটিলতা। এই কোম্পানিগুলো শুধু বড় বিনিয়োগকারী ও কর্মসংস্থানদাতাই নয়, রাষ্ট্রীয় বাজেটেও বড় অবদান রাখে — ফলে তাদের কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখতে সরকারের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনা থাকে। জাঙ্গেজুর তামা-মলিবডেনাম কমপ্লেক্সে রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রক অংশীদারত্ব রয়েছে, আর ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এই কমপ্লেক্সই ছিল আর্মেনিয়ার সবচেয়ে বড় করদাতা।
অর্থনৈতিক স্বার্থ আর পরিবেশ সুরক্ষার এই টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে কপ১৭ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে, যখন আর্মেনিয়া বিতর্কিত আমুলসার সোনার খনির উদ্বোধন করে। গ্লোবাল ফরেস্ট কোয়ালিশনসহ পরিবেশ সংগঠন ও আর্মেনিয়ার নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছে; তাদের অভিযোগ, এতে দীর্ঘদিনের পরিবেশ উদ্বেগ এবং বার্ন সনদের সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আমুলসারবিরোধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও মামলার নথিও তুলে ধরেছে। অন্যদিকে আর্মেনিয়ার অর্থমন্ত্রী অর্থনৈতিক যুক্তিতে প্রকল্পটির পক্ষে সাফাই দিয়েছেন — তার দাবি, এটি দেশের জিডিপিতে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ অবদান রাখতে পারে এবং বছরে প্রায় ১৩ কোটি ডলার কর ও অন্যান্য অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে পারে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বী অগ্রাধিকারগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এমন সময়ে, যখন আর্মেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চাইছে এবং মস্কো থেকে নিজেকে দূরে সরাচ্ছে। ইইউ–আর্মেনিয়া কৌশলগত এজেন্ডায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন আইনের জোরদার বাস্তবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং বায়ুর গুণমান, পানি সুরক্ষা ও শিল্প নির্গমনে আরও পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
কপ১৭-তে সরকারগুলো কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতির ক্ষয় থামানো ও উল্টে দেওয়া। সম্মেলন থেকে বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে একটি ‘ইয়েরেভান পথ’ চূড়ান্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই ম্লান: সম্মেলনের আগে প্রকাশিত ‘স্টেট অব বায়োডাইভারসিটি অ্যাকশন’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মূল্যায়ন করা জাতীয় লক্ষ্যগুলোর অর্ধেকেরও কম সঠিক পথে রয়েছে।
অর্থায়নও বড় বাধা হয়ে আছে। উন্নত দেশগুলো আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য অর্থায়নে বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার দিয়েছে, যা ২০২৫ সালের ২ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্যের চেয়ে কম। অন্যদিকে, প্রকৃতি থেকে পাওয়া জিনগত তথ্যে মুনাফা করা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যে গঠিত ক্যালি তহবিলে জমা পড়েছে মাত্র ৬ হাজার ডলার। এই ঘাটতিগুলোই দেখিয়ে দেয়, প্রতিশ্রুতিকে কাজে রূপ দিতে সরকারগুলো কতটা সংগ্রাম করছে।
কপ১৭-এর আয়োজক হিসেবে আর্মেনিয়াকে এখন দেখাতে হবে, ইয়েরেভানে যে প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো নিজের খনি শিল্প, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণকর্মীদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অংশগ্রহণকারী সরকারগুলোর উচিত সম্মেলনটিকে কাজে লাগিয়ে আর্মেনিয়া কর্তৃপক্ষের ওপর পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা, বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং আমুলসারের মতো প্রকল্প ঘিরে নাগরিক সমাজের উদ্বেগ নিরসনের চাপ তৈরি করা।




