রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া হুথি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে ধ্বংসের দাবি সৌদি জোটের, তিন এলাকায় জরুরি সতর্কতা
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে প্রতিহত করে ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিয়াদসহ তিনটি এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল, পরে কর্তৃপক্ষ জানায় তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও সতর্কতা জারির তথ্য জানা গেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করার পর দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটিকে প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে।
জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ভোর ৪টার ঠিক পরপরই ভূপাতিত করা হয়। এর আগে রাত ১টার দিকে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দিকে হুথিদের ছোড়া দুটি ড্রোনও বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রতিহত ও ধ্বংস করে বলে তিনি জানান।
এর আগে সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদ, নাজরান ও ওয়াদি আল-দাওয়াসির এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব এলাকায় তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে। বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি কোথাও ভিড় না করতে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে।
শুক্রবার খামিস মুশাইত লক্ষ্য করেও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, যা মাঝপথেই প্রতিহত করা হয় বলে সৌদি জোট জানিয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছিল জোট বাহিনী। অর্থাৎ একই সময়ে একাধিক দিক থেকে হামলার চেষ্টা ও সেগুলো ঠেকানোর দাবি সামনে এসেছে।
জোটের তথ্য অনুযায়ী, কেবল অক্টোবর মাসেই হুথিরা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে অন্তত ১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। রিয়াদ ও খামিস মুশাইতের পাশাপাশি নাজরান, পূর্ব প্রদেশ এবং গত ১৫ অক্টোবর মদিনা অঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে জোটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিরা তাদের হামলায় নিয়মিতভাবে বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসে এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ২৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩৭৪ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত ৭ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে বিমানবন্দরটিতে চালানো বিভিন্ন হামলায় ১৮ জন নিহত ও ৩৩৩ জনের বেশি আহত হন। এর মধ্যে কেবল ১০ অক্টোবরের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। এ ছাড়া আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং শায়বাহ তেল স্থাপনাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
হুথিদের এই ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, মিশর এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ। সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে এই নিন্দা জানানো হয়েছে। বাহরাইন অবিলম্বে হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে এবং সতর্ক করে বলেছে, এই উত্তেজনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে জনমত প্রভাবিত করতে নতুন প্রচারকৌশলও নিয়েছে হুথিরা। যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথিকে হাতিয়ার করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিবৃতি, ভিডিও, গান, বক্তৃতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে গোষ্ঠীটি। বিশেষ করে পবিত্র কাবার গিলাফের আদলে তৈরি কাপড় এপস্টেইনকে উপহার দেওয়ার তথ্যকে সামনে এনে তারা সৌদি আরবের সমালোচনা করছে।
হুথিদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত এই প্রসঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন। ইয়েমেনের কৌতুক অভিনেতা মুস্তাফা আল-মোমারি, যার এক্সে অনুসারী ২৭ লাখের বেশি, এ বিষয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছেন এবং ইয়েমেনের একজন ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পী অভিযোগটি নিয়ে গানও লিখেছেন। হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির বক্তৃতায়ও এপস্টেইনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ নিয়ে সৌদি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। এপস্টেইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে মারা যান; কর্মকর্তারা তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে জানিয়েছিলেন।
পেছনের প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি ও নিজেদের সীমান্তে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে দেশটির গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হলেও চলতি বছর সেই ভঙ্গুর শান্তি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা এবং এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে প্রচার—দুটি ঘটনাই সৌদি আরব ও হুথিদের উত্তেজনার দুটি ভিন্ন দিক তুলে ধরছে। একদিকে সামরিক হুমকি ও আকাশ প্রতিরক্ষার তৎপরতা, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের চেষ্টা।
এখন নজর থাকবে হামলা-পাল্টা দাবির এই ধারা কোথায় গিয়ে থামে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা এগোয়, সেদিকে। ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ নিয়ে জোটের বক্তব্য এবং হুথিদের অভিযোগ পৃথকভাবে মূল্যায়নের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।






