জার্মানি কি সত্যিই ইউরোপের ‘অসুস্থ মানুষ’, নাকি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি: বিনিয়োগ উপদেষ্টা ব্লেসিংয়ের আশাবাদ
জার্মানি কি সত্যিই ইউরোপের ‘অসুস্থ মানুষ’, নাকি দেশটির অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে — এই প্রশ্নই এখন বার্লিনের নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে। বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট ইন জার্মানি’ বিনিয়োগ সম্মেলনের পর চ্যান্সেলরের বিনিয়োগবিষয়ক ব্যক্তিগত দূত মার্টিন ব্লেসিং আশাবাদী মূল্যায়ন দিয়েছেন।
এই সম্মেলনে প্রযুক্তি খাতের বড় নামগুলো অংশ নিয়েছে, যাদের মধ্যে ছিলেন এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের মতো শীর্ষ নির্বাহীরা। এত বড় মাপের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির পর ব্লেসিং ইতিবাচক হিসাব তুলে ধরলেও আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সেই প্রশ্নটি হলো, ঘোষিত এই বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থের মধ্যে আসলে কতটা সত্যিকারের নতুন টাকা, আর কতটা আগে থেকে পরিকল্পিত বিনিয়োগের পুনর্ঘোষণা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানির আমলাতন্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লবের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কি না।
ব্লেসিং নিজে এক সময় কমার্জব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে একটি বড় প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখছেন বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
শরতের বার্লিনে হাঁটতে হাঁটতে দেওয়া এই আলোচনায় সাবেক এই ব্যাংকার ব্যাখ্যা করেছেন, কেন জার্মানির পেনশন ব্যবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে পুঁজিভিত্তিক অর্থায়ন দরকার। এ ক্ষেত্রে তিনি স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মডেলের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আলোচনায় উঠে এসেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জার্মানিতে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা আফডি দলের উত্থানকে কীভাবে দেখছেন, সেই প্রসঙ্গও। রাজনৈতিক এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও কথা হয়েছে।
ব্লেসিংয়ের মতে, জার্মানির সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা দুটি — আসন্ন দক্ষ কর্মীর ঘাটতি এবং ইউরোপজুড়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান। এই দুটি বিষয়ই বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে জার্মানির গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের ভেতরের চিত্রও তুলে ধরেছেন এবং জার্মানদের আত্মকরুণা বা হা-হুতাশের মনোভাব ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশটি চাইলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার প্রমাণ অতীতেই রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা এবং ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট মোকাবিলার কথা উল্লেখ করেছেন। ওই সময়গুলোতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকায় অনুমোদন ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে এগিয়েছিল।
ব্লেসিংয়ের যুক্তি, ঠিক সেই গতিটাই এখন দরকার ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জার্মানির অবস্থান ধরে রাখতে। ধীর আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলতে থাকলে প্রযুক্তি দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
ফলে বার্লিনের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ — একদিকে ঘোষিত বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নতুন বিনিয়োগে রূপ দেওয়া, অন্যদিকে পেনশন সংস্কার, কর্মী ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রণ সরলীকরণের মতো কাঠামোগত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
ব্লেসিংয়ের আশাবাদ শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবে মিলবে, তা নির্ভর করবে এই প্রতিশ্রুতি ও সংস্কারগুলো মাঠে কত দ্রুত নামে তার ওপর। জার্মানির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি তাই এখনো লেখা হচ্ছে, যার পরের অধ্যায় নির্ধারণ করবে বাস্তবায়নের গতি।




