ঘটনাহীন দুর্গোৎসবের পর আলোচনায় সম্প্রীতি: এই আনন্দ যেন শুধু উৎসবের দিনে নয়, থাকে সারা বছর
২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসব শেষ হলেও পূজামণ্ডপের আনন্দ, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা, আরতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর বিসর্জনের নানা মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডে এখনো ঘুরেফিরে আসছে।
এসব দৃশ্য কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আনন্দের চিত্র নয়; বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতিরও প্রতিচ্ছবি—এমনটাই উঠে এসেছে এবারের উৎসব নিয়ে আলোচনায়।
এবারের দুর্গোৎসবের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পূজাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপনের এই চিত্র স্বস্তিদায়ক। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও হাজির করেছে—এমন নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশ কি কেবল উৎসবের কয়েকটি দিনের জন্য, নাকি সব নাগরিকের সারা বছরের অধিকার?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। সেই বিবেচনায় এবারের দুর্গোৎসবে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রাখায় সরকারের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে; তখন উৎসবের দিনগুলোতে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে এই সাফল্যকে স্থায়ী করতে হলে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমাল, উপাসনালয়, সম্পত্তি ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সারা বছর কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে—এমন দাবিও উঠেছে আলোচনায়।
রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও এবারের দুর্গোৎসবের তাৎপর্য রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রত্যাশা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে নাগরিকেরা যে দলকেই সমর্থন করুন না কেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা থাকে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক দায়িত্বেরও অংশ।
এবারের দুর্গোৎসবে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের অনেকে অসাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সশরীরে পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়েছেন, পূজারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন এবং তাঁদের আনন্দে অংশ নিয়েছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়।
এই উপস্থিতি নিছক সৌজন্য বিনিময় নয়; এর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সংহতির বার্তা। অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ যখন ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে মানবিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, তখনই সমাজের প্রকৃত শক্তি প্রকাশিত হয় বলে মনে করা হচ্ছে।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—বহুল প্রচলিত এই বাক্য এবারের দুর্গোৎসবে নতুন করে তাৎপর্য পেয়েছে। তবে বাক্যটির মর্মার্থ শুধু অন্য ধর্মের উৎসবে যোগ দেওয়া কিংবা শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো, ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তির নিজস্ব বিষয় হলেও উৎসবের আনন্দ, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতি সবার জন্য উন্মুক্ত।
তবে সম্প্রীতির এই চিত্রের বিপরীতে সমাজের আরেকটি বাস্তবতাও আলোচনায় এসেছে। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া কিংবা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা এ দেশে নতুন নয়। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতাকে সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলা হয়েছে।
এবার পূজার সময়ে ওয়াজ-মাহফিল আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা। কোনো ধর্মীয় আয়োজনের ওপর নির্বিচার নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান নীতি, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের আদর্শ—এমন মত এসেছে আলোচনায়।
সবশেষে বলা হচ্ছে, বিজয়া দশমীর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিকতার যে শিক্ষা এই উৎসব দিয়ে যায়, তার চর্চা যেন থেমে না যায়। উৎসবের ছবিগুলো নিউজফিড থেকে একসময় হারিয়ে যাবে; থেকে যাবে মানুষের আচরণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আর সামাজিক মূল্যবোধের বাস্তব পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দায়িত্ব সরকার, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ নাগরিক—সবার।




