দুই ডোজ বিষেও মৃত্যু হয়নি: টেনেসিতে ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ভয়াবহ বিবরণ আদালতে
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে এক নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার বিস্তারিত ও মর্মান্তিক বিবরণ নতুন আদালত নথিতে উঠে এসেছে। ক্রিস্টা পাইক ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা চলাকালে পেন্টোবারবিটালের দুই ডোজ দেওয়ার পরও বেঁচে যান। তার এক আইনজীবীর সাক্ষ্য অনুযায়ী, শিরায় লাইন বসাতে গিয়ে কার্যকরকারী দলের সদস্যরা হিমশিম খেয়েছিলেন এবং একাধিকবার শিরা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
পাইকের আইনজীবীদের একজন, টেনেসি পোস্ট-কনভিকশন ডিফেন্ডার দপ্তরের র্যান্ডি স্পাইভি, যিনি ওই চেষ্টা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, নতুন দাখিল করা এক ঘোষণাপত্রে বলেছেন, টেনেসি সংশোধন বিভাগের আইভি দল পেন্টোবারবিটাল দেওয়ার জন্য আনুমানিক ১০টি সুই ব্যবহার করেছিল বলে তার কাছে মনে হয়েছে। বিকেল ৬টা ৩৪ মিনিটে দলটি শিরা খুঁজতে শুরু করে, একজন সদস্যকে শিরা খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে দেখা যায় বলেও তিনি লিখেছেন।
স্পাইভির বর্ণনা অনুযায়ী, আইভি লাইন বসানোর চেষ্টার বিভিন্ন পর্যায়ে দলের সদস্যরা নিশ্চিত ছিলেন না সুই ঠিকমতো ঢুকেছে কি না এবং তারা মনে করছিলেন পাইকের শিরা সম্ভবত ফেটে গেছে। বাম কাঁধে সুই ঢোকানোর চেষ্টার সময় পাইক যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এক সদস্য যখন বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা ফেটে গেছে,’ তখন তারা ঢোকানোর জায়গাটি পরীক্ষা করেন এবং আরেক সদস্য বলেন, ‘চলুন আবার নতুন করে শুরু করি।’
সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটে আইভি দল লাইন ঠিকমতো বসেছে বলে সন্তুষ্ট হয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায় বলে স্পাইভি লিখেছেন। তবে প্রায় ১০ মিনিট পর পাইক বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমার হাত ফেটে যাবে। পুড়ছে।’ স্পাইভি লিখেছেন, পাইক বলেন তার হাতের একটি জায়গা ‘সত্যিই পুড়ছে’ এবং তাতে ব্যথা হচ্ছে। এরপর তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসে এবং তিনি নাক ডাকা ও শ্বাসরোধের মতো শব্দ করতে শুরু করেন।
রাত ৮টা ৬ মিনিটে পাইকের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা স্পাইভির কানে ফিসফিস করে বলেন, ‘তিনি এখনো বেঁচে আছেন।’ স্পাইভি তার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, অঙ্গরাজ্যের প্রোটোকল অনুযায়ী পেন্টোবারবিটালের তৃতীয় ডোজ অনুমোদিত নয়। রাত ৮টা ৪০ মিনিটে কারাগার থেকে কেউ একজন ৯১১ নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স চান—মেট্রো ন্যাশভিল জরুরি যোগাযোগ কেন্দ্রের প্রকাশ করা কল ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী এই তথ্য জানা গেছে।
টেনেসি সংশোধন বিভাগের কাছে স্পাইভির এই বিবরণ সম্পর্কে মন্তব্য চেয়েছে এবিসি নিউজ। বিভাগটি আগেই বলেছিল, তারা অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের অনুমোদিত অঙ্গরাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রোটোকলের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে এবং প্রোটোকলে থাকা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
স্পাইভির ঘোষণাপত্রটি বৃহস্পতিবার দাখিল করা একটি আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে টেনেসির কয়েকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির গত বছর করা একটি অভিযোগে নতুন প্রমাণ যোগ করার আবেদন জানানো হয়েছে—মিডল টেনেসির ফেডারেল পাবলিক ডিফেন্ডারদের পক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী এমনটাই জানা গেছে। আবেদনে পাইকের ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে স্পাইভির বিবরণসহ নতুন প্রমাণ বিবেচনা করতে আদালতকে বলা হয়েছে। ওই অভিযোগে টেনেসির প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রোটোকলের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে; অভিযোগে বলা হয়েছে পেন্টোবারবিটাল ‘যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকি’ তৈরি করে এবং এর ব্যবহার বন্ধ চাওয়া হয়েছে।
এবিসি নিউজ অভিযোগ ও নতুন আবেদন সম্পর্কে টেনেসি অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের কাছেও মন্তব্য চেয়েছে। অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি খারিজের আবেদন করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাইক নিজে ওই অভিযোগে নাম থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে নেই, তবু তার অভিজ্ঞতাই এখন সেই মামলার নতুন প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে।
টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একমাত্র নারী পাইক ১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমার হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পান। ব্যর্থ কার্যকরের পর তাকে লাইফ সাপোর্টে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল; প্রায় এক সপ্তাহ পর ৬ অক্টোবর তিনি জ্ঞান ফিরে পান বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন। এরপর তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে আবার কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে বলেও তারা জানান।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পেন্টোবারবিটালের কারণে পাইকের হাতে পোড়া ক্ষত হয়েছে এবং জ্ঞান ফেরার পর তার জ্ঞানীয় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ওষুধ দেওয়ার পর প্রাণঘাতী ইনজেকশন থেকে বেঁচে গেছেন বলে জানা গেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এই ব্যর্থ চেষ্টাকে ‘আমাদের দেখা সবচেয়ে খারাপ এবং আধুনিক যুগের অন্য যেকোনো ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে আলাদা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কার্যকরের আগের মাসগুলোতেও পাইকের আইনজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন; তাদের যুক্তি ছিল, কার্যকরে ব্যবহৃত ওষুধগুলো ব্যথা ও কষ্টের বিশাল ঝুঁকি বহন করে। তারা টেনেসির গভর্নর বিল লির কাছে পাইকের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, প্যারোলের সম্ভাবনা ছাড়া, কমিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পাইকের ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর গভর্নর লি অঙ্গরাজ্যে নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সাময়িকভাবে স্থগিতের নির্দেশ দেন এবং চলতি মাসের শুরুতে টেনেসি সংশোধন বিভাগের কমিশনার ফ্র্যাংক স্ট্রাডা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। গভর্নরের দপ্তর জানিয়েছে, সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি এড স্ট্যান্টনকে টেনেসি সংশোধন বিভাগের কার্যকর চেষ্টার স্বাধীন পর্যালোচনা করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এই পর্যালোচনায় দেখা হবে প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং অঙ্গরাজ্যের প্রোটোকল আইনসম্মত ও কার্যকর রাখতে অতিরিক্ত সুপারিশ প্রয়োজন কি না। এখন আদালতের মামলা, গভর্নরের স্থগিতাদেশ এবং স্বাধীন পর্যালোচনা—এই তিনটি প্রক্রিয়ার ফলই নির্ধারণ করবে টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশন আবার কবে এবং কীভাবে ফিরবে।




