টাকায় চারটি লাউ: পঞ্চগড়ে বাম্পার ফলনেও গরুকে খাওয়াচ্ছেন ক্ষেতের ফসল চাষিরা
পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে, অথচ সেই ফলনই এখন চাষিদের বিপদের কারণ। ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। কোথাও এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে চারটি লাউ, আবার কোথাও প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই থেকে পাঁচ টাকায়।
সরেজমিনে জেলার আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেক কৃষক লাউয়ের বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাগান কেটে ফেলছেন, আবার কেউ ক্ষেতের লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন।
চাষিদের হিসাবটা নির্মম। তারা বলছেন, এক কেজি মোটা চাল কিনতেও বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় ২০০টি লাউ। আর প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০ টাকা হিসাবে, তা কিনতে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় তিন হাজারটি লাউ। ঘাম ঝরিয়ে ফলানো ফসলের এমন দরপতনে হতাশ হয়ে পড়েছেন আটোয়ারীর লাউচাষিরা।
অভিযোগের আরেকটি দিক আছে। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কেনা সেই লাউই খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে দাম অত্যন্ত কম হলেও ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে তুলনামূলক বেশি দাম—আর মাঝের এই ব্যবধানে উৎপাদক কোনো লাভের মুখ দেখছেন না।
উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। এই আবাদে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ পুরো মৌসুমে লাউ বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা। এতে শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুলাল ইসলাম বলেন, এত কষ্ট করে লাউ চাষ করেও যখন দাম পাওয়া যাচ্ছে না, তখন লোকসান মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না। দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে হতাশ হয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন এবং ক্ষেতের লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন বলেও জানান।
দুলাল ইসলাম উৎপাদক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, উৎপাদক পর্যায়ে লাউয়ের দাম কম থাকলেও বাজারে ক্রেতাদের প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
একই ইউনিয়নের ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার চাষি আনসারুল ইসলাম জানান, লাউয়ের দাম না থাকায় গত ১০ দিন ধরে তিনি বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। একদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অথচ ক্ষেতের লাউ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পিস।
আনসারুল ইসলামের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে ফসল বিক্রি করতে হলে কৃষকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। কষ্ট করে ফসল ফলিয়েও যদি দাম না পাওয়া যায়, তাহলে মানুষ একসময় কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলী বলেন, এবার এলাকায় লাউয়ের আবাদ ও ফলন দুটোই ভালো হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। বাইরের বাজারেও আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ভালো ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের লোকসানে পড়তে হচ্ছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত করা এবং কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার কার্যকর ব্যবস্থা না হলে এ ধরনের লোকসান কৃষিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড় জেলায় বছরে প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়। অর্থাৎ এই ফসল জেলার কৃষি অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে জড়িত।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে দরপতনের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে স্থানীয় কৃষি দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভালো ফলন সত্ত্বেও উৎপাদিত লাউয়ের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ আটোয়ারীর চাষিরা। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় তাদের লোকসান কমাতে কার্যকর উদ্যোগের দাবি উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে—না হলে আগামী মৌসুমে অনেকেই এই আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।



