নাইজেরিয়ার ইবোলা রোগী কঙ্গো যাননি, সংক্রমণের উৎস নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা
নাইজেরিয়ায় শনাক্ত হওয়া ইবোলা রোগী গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে যাননি বলে জানিয়েছে সুইজারল্যান্ড। এক দশকের বেশি সময় পর দেশটিতে প্রথম ইবোলা রোগী কীভাবে সংক্রমিত হলেন, তা খুঁজতে আফ্রিকাজুড়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখন তৎপর। প্রাদুর্ভাবটি চতুর্থ আফ্রিকান দেশে পৌঁছে যাওয়ায় এর আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, নাইজেরিয়ার ওই রোগী আবুজায় অবস্থানরত এক সুইস কূটনীতিকের উগান্ডায় জন্ম নেওয়া স্ত্রী। তিনি কঙ্গোতে ভ্রমণ করেননি। মন্ত্রণালয়ের ধারণা, স্বামীর সঙ্গে উগান্ডায় ভ্রমণের সময় তিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
নতুন এই তথ্য উগান্ডার আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না। উগান্ডা আগে বলেছিল, ওই নারী পূর্ব কঙ্গোতে ভ্রমণ করেছিলেন। ফলে প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। এই প্রাদুর্ভাবকে ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত বলা হচ্ছে।
উগান্ডা সরকার মে ও জুন মাসে দেশে ইবোলা আক্রান্তের খবর দিয়েছিল, এরপর আগস্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) দেশটিকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে। উগান্ডা সরকারের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেছেন, উগান্ডায় কোনো ইবোলা রোগী নেই; থাকলে তা প্রকাশ করা হতো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নাইজেরিয়ার রোগীর সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস খুঁজতে তদন্ত চলছে। ফলে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, তিনি কোথা থেকে ভাইরাসটি বহন করেছেন।
আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (আফ্রিকা সিডিসি) খতিয়ে দেখছে, ওই রোগী কেনিয়ার কোনো ইবোলা রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না। সংস্থাটির জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া বিভাগের প্রধান ড. ওয়েসাম মানকৌলা জানিয়েছেন, দুজনই ৩ অক্টোবর উগান্ডার এনতেব্বে বিমানবন্দর দিয়ে ভ্রমণ করেছিলেন।
কঙ্গোতে ডব্লিউএইচওর ইবোলা ঘটনা ব্যবস্থাপক ক্যাথরিন স্মলউড শুক্রবার জেনেভায় জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ে ভিডিও লিংকে জানান, কঙ্গোতে থাকা ডব্লিউএইচও কর্মীদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই যা দেখায় যে নাইজেরিয়ার রোগী সেদেশে গিয়েছিলেন।
স্মলউড বলেন, কেনিয়ার রোগীর সঙ্গে একটি যোগসূত্র সম্ভব হলেও নাইজেরিয়ার রোগীর উপসর্গ শুরুর সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে—সংক্রমণ উগান্ডার বিমানবন্দরে ঘটেছে, নাকি অন্য কোথাও।
তবে এই তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ডাচ ভাইরোলজিস্ট ও ডব্লিউএইচওর ইবোলা জরুরি কমিটির সদস্য মারিয়ন কুপম্যানস। তিনি বলেন, একই স্থানে এলোমেলো উপস্থিতি—তাও একটি বড় বিমানবন্দরে—বর্তমান জ্ঞান অনুযায়ী মহামারিবিদ্যার দিক থেকে সমর্থিত কোনো যোগসূত্র নয়, প্রমাণ ছাড়া এটি খুবই অনুমাননির্ভর।
নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলী পাতে বলেছেন, দেশের এই রোগীর ঘটনা এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খোঁজ চলছে। তিনি বলেন, তারা এটিকে সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে চেষ্টা করছেন এবং তা যাতে না ঘটে, সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন।
প্রসপার গ্লোবালের (সাবেক মার্সি কোর) আফ্রিকা বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেলাকু ইয়ারগা বলেছেন, কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় ইবোলা নিশ্চিত হওয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে, আরও সংক্রমণ ঠেকাতে দেশগুলোর ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। তার ভাষায়, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গতি, দেরি না করে সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য ভাগ করা এবং সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর হাতে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ পৌঁছে দেওয়া।
ইবোলা একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রায়ই প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যা মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটকে আক্রান্ত করে। শরীরের তরল বা দূষিত উপকরণের মাধ্যমে এটি ছড়ায় এবং অঙ্গক্ষতি, রক্তনালির ক্ষতি, এমনকি গুরুতর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি বিরল বুন্দিবুগিও ভাইরাসের কারণে হচ্ছে, যার কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা বা টিকা নেই। গত ১৫ মে এটি প্রথম ঘোষণা করা হয়; এতে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৫০০ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় অর্ধেকই মারা গেছেন।
এই প্রাদুর্ভাব কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী এবং বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয়—শুধু ২০১৪–১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার প্রাদুর্ভাবের পেছনে, যাতে ২৮ হাজার ৬০০ জনের বেশি আক্রান্ত ও ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। নাইজেরিয়ার রোগীর সংক্রমণের উৎস নিশ্চিত হওয়ার ওপরই এখন নির্ভর করছে পরবর্তী প্রতিরোধ পদক্ষেপের দিক।






