তাইওয়ানে চাম্পির তাণ্ডব বাড়ছে: আহত বেড়ে ১৭১, শনিবার সকালেই বৃষ্টির চরম রূপের আশঙ্কা
তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া শক্তিশালী টাইফুন চাম্পির প্রভাবে পূর্ব এশিয়াজুড়ে শুক্রবার শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তাইওয়ানে স্কুল ও অফিস বন্ধ রাখা হয়েছে। ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানবে কি না তা নিশ্চিত না হলেও শনিবার পর্যন্ত দ্বীপের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৯০ সেন্টিমিটার (৩৫ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টি ও শক্তিশালী বাতাসের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে ঝড়ে আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ জনে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাইওয়ানের লিউকিউ দ্বীপে ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের কারণে এক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাইওয়ান এখন শনিবার চাম্পির সবচেয়ে খারাপ প্রভাবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে চাম্পির বাতাসের ঝোড়ো গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৯১ কিলোমিটার (১১৯ মাইল)। এর আগে এই সপ্তাহের শুরুতে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছে এটি ছিল এ বছরের এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড় — ফিলিপাইন সাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এর সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৯৮ কিলোমিটার (১৮৫ মাইল), যা ক্যাটাগরি ৫ হারিকেনের সমতুল্য।
প্রথমে ‘সুপার টাইফুন’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হলেও বুধবার চাম্পি কিছুটা দুর্বল হয়। তাইওয়ান, হংকং ও জাপানের আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী ঝড়ের কেন্দ্র তাইওয়ানে স্থলভাগে আঘাত না হানিয়েই পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কথা। তবে তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের এক পূর্বাভাসদাতা রয়টার্সকে বলেছেন, আঘাত হানার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না — বিশেষ করে ঝড়টি উপকূলের কাছে এসে ‘থেমে গেলে, ঘুরপাক খেলে বা এদিক-ওদিক দুললে’।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন জানিয়েছে, শনিবার সকালে বৃষ্টিপাত চরমে পৌঁছাবে এবং শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাইওয়ানে এর প্রভাব থাকবে। কর্তৃপক্ষ মানুষকে উপকূল ও পাহাড়ি এলাকা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
চাম্পি এগিয়ে আসায় শুক্রবার তাইওয়ানের ২২টি কাউন্টি ও শহরের প্রায় সবগুলোতেই কাজ ও ক্লাস স্থগিত ছিল — যা স্থানীয়ভাবে ‘টাইফুন ছুটি’ নামে পরিচিত। গুরুতর আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার তাইওয়ানের ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের (৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন পাউন্ড) শেয়ারবাজারও বন্ধ ছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল মূল দ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত কিনমেন কাউন্টি, যেখানে কাজ ও ক্লাস স্বাভাবিকভাবেই চলেছে।
তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত ও দক্ষিণ জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে চাম্পি চীনের পূর্ব উপকূলের পাশের জলসীমায় কিছু সময় অবস্থান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর তা আরও উত্তর-পূর্বে বাঁক নিয়ে জাপানের মূল দ্বীপের দিকে যাবে।
জাপানেও প্রভাব পড়েছে ঝড়ের। ওকিনাওয়া ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, দক্ষিণের ওকিনাওয়া প্রিফেকচারে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়েছে। জাপানের চারটি বিমান সংস্থা মিলিয়ে ১৬০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
ফিলিপাইনেও ছড়িয়েছে চাম্পির প্রভাব। তাইওয়ানের দক্ষিণে অবস্থিত বাতানেস দ্বীপপুঞ্জে ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাস বয়ে গেছে। স্থানীয় সরকারের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উপকূলীয় গ্রামগুলোতে ঢেউ আছড়ে পড়ছে এবং সড়কে যান চলাচল বন্ধ। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
চাম্পি এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক তীব্র টাইফুনগুলোর সর্বশেষটি। প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী সুপার এল নিনো সাগরকে উষ্ণ করে ঝড়গুলোকে জ্বালানি জোগাচ্ছে। এ বছর এ অঞ্চলে টাইফুনের মৌসুম অত্যন্ত সক্রিয় রূপ নিচ্ছে — চাম্পি জাপানের এ বছরের ৩০তম টাইফুন, ২০১৩ সালের পর এই প্রথম কোনো বছরে এতগুলো ঝড় দেখা গেল।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরে দেখা দেয় এবং খরা থেকে টাইফুন পর্যন্ত চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটাতে পারে। এবারের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোকেই সাম্প্রতিক ঘনঘন ঝড়ের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন সবার নজর শনিবার সকালের দিকে — পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি চরমে পৌঁছালে তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ঝড়টি স্থলভাগ এড়িয়ে গেলেও এর বাইরের ব্যান্ডের প্রভাবেই দ্বীপটিকে সপ্তাহান্তজুড়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।






