ভারতে নতুন খনিজ আইন নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য মুখোমুখি, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি কয়েকটি রাজ্যের
ভারতে খনি ও খনিজসম্পদের ওপর কর বসানোর ক্ষমতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলোর নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। পার্লামেন্টে পাস হওয়া খনি ও খনিজ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী আইন-২০২৬-এর মাধ্যমে খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে এবং রাজ্যগুলোর কর আরোপের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত শর্ত ছাড়া খনিজের অধিকার ও খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর নতুন করে কর বসানো যাবে না। একই সঙ্গে আইন কার্যকর হওয়ার আগে রাজ্যগুলো যে কর আরোপ করেছিল কিন্তু পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি, সেই বকেয়া দাবিও বাতিল করা হয়েছে। এই দুটি বিধানই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী খনি ও খনিজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভাগ করা। রাজ্য তালিকার বিধানে খনি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাজ্যগুলোর হাতে থাকলেও কেন্দ্রীয় তালিকার বিধান অনুযায়ী সেই ক্ষমতা পার্লামেন্টের তৈরি কেন্দ্রীয় আইনের অধীন। আবার খনিজের অধিকার ও জমির ওপর কর বসানোর ক্ষমতাও রাজ্যগুলোর রয়েছে বলে সংবিধানে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে একটি সাংবিধানিক অবস্থান দিয়েছিল। আদালত তখন বলেছিল, জনস্বার্থে পার্লামেন্ট বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারলেও রাজ্যগুলোর খনিজ অধিকারের ওপর কর বসানোর ক্ষমতা রয়েছে, এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজ্যগুলোর খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর করের ক্ষমতা খর্ব করা যায় না। সমালোচকদের মতে নতুন আইন সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যে খনিজের ওপর ভিন্ন ভিন্ন ও একাধিক ধরনের কর বসানোর ফলে দেশীয় খনিজের দাম বেড়ে যায়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় খনিজের বদলে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং কোষাগারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
রাজ্যগুলোর জন্য বিষয়টি সরাসরি রাজস্বের প্রশ্ন। ঝাড়খণ্ড ও ওডিশায় খনিজ থেকে পাওয়া আয় রাজ্য দুটির করবহির্ভূত রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ। কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে এই অংশ যথাক্রমে প্রায় ৪৮, ৪১ ও ৩৯ শতাংশ। ফলে কর বসানো বা বহাল রাখার ক্ষমতা সীমিত হলে এসব রাজ্যের আয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়ে খনিজ রাজস্বের অংশ তুলনামূলকভাবে কম, যথাক্রমে প্রায় ১১ ও ৬ শতাংশ। তবু শুধু রাজস্বের অঙ্ক দিয়েই রাজ্যগুলোর প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ওডিশায় এ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি। বিরোধী বিজু জনতা দল আইনটির তীব্র সমালোচনা করে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছে। তবে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সংশোধিত আইনে ওডিশার খনিজ রাজস্বের ক্ষতি হবে না।
অন্যদিকে তেলেঙ্গানা, যেখানে খনিজ আয়ের অংশ মাত্র ১১ শতাংশ, আইনটিকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নিয়েছে। কর্ণাটক, হিমাচল প্রদেশ ও কেরালাও একই পথে এগোনোর পরিকল্পনা করছে। তাদের যুক্তি, রাজ্যগুলোর করের ক্ষমতা সীমিত হলে আর্থিক ক্ষমতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোও দুর্বল হবে।
কেরালা অতিরিক্ত একটি আপত্তিও তুলেছে। রাজ্যটির মতে খনিজসমৃদ্ধ জমিকে আইনের আওতায় আনায় কেন্দ্রের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হচ্ছে, যার প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চল ও বনাঞ্চলের মতো ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন সতর্ক করে বলেছেন, খনিজ কর থেকে রাজস্ব হারালে লাখ লাখ মানুষের উপকারে আসা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলো থেকে এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে, রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা থাকলেই সব রাজ্য একইভাবে প্রতিবাদ করছে না; কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সম্পর্কও বিরোধের গতি নির্ধারণ করছে।
ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। জিএসটি ক্ষতিপূরণ, জাতীয় শিক্ষানীতি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মতো ইস্যুতেও এই বিরোধ আগেও সামনে এসেছে। নতুন খনিজ আইন সেই ধারাবাহিকতায় আরও একটি বড় বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি করল, যার পরবর্তী অধ্যায় এখন সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।






