আগাম নোটিশ ছাড়াই কার্যকর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: জেদ্দা কনস্যুলেটের চিঠিতে উঠে এল সৌদির নীরবতার চিত্র
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রবাসী সুরক্ষার পুরো ব্যবস্থা। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া চিঠির সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা দূতাবাসকে কোনো পূর্ব নোটিশই দেয়নি।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নারী ও পুরুষের শিরশ্ছেদ করা হয়; তাঁদের একজন নজরুল ইসলাম, আরেকজন সুইটি আক্তার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রথম পর্যায়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি জানত না — ঘটনাটি ঘটার পর, অর্থাৎ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হওয়ার পরই তারা জেনেছে।
জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের চিঠি অনুযায়ী, কনস্যুলেট পুরো বিষয়টি সৌদি গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছে। সেই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা কোনো আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবেন কি না, সেটাও কনস্যুলেটকে জানানো হয়নি।
চিঠিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, সৌদি সরকার বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে আড়াই হাজার বন্দীর একটি সাধারণ তালিকা পাঠিয়েছিল, যেখানে এই দুই বন্দীর নাম ছিল, কিন্তু কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না। অর্থাৎ তাঁরা যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাঁদের মামলার বর্তমান অবস্থা কী — এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সেই তালিকায় ছিল না। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের ধরন নিয়েও অস্পষ্টতা কাটেনি। অভিযোগে বলা হয়েছে, মসজিদে অনৈতিক কাজের জন্য অভিযুক্তদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু দুই বাংলাদেশির অনৈতিক কাজের ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য আসছে, সেটাও শিরশ্ছেদ করার মতো অপরাধ নয় বলেই অধিকাংশ মানুষ মতামত প্রকাশ করছেন।
মামলার সময়কাল নিয়েও মিলছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, দীর্ঘ চার মাস ধরে তাঁদের অপরাধ নিয়ে সৌদিতে মামলা চলেছে; আবার নজরুলের পরিবারের সূত্রে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেছে, দুই বছর ধরে নাকি এই মামলা চলেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য আদান-প্রদান না হবে, ততক্ষণ অনুমানের ভিত্তিতে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছেই।
সৌদি সরকার শাস্তি কার্যকর করার আগে বাংলাদেশ সরকার কিংবা অভিযুক্তদের পরিবারকে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে বলে শোনা যায়নি। অর্থাৎ আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে — যাকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভিয়েনা প্রটোকল অনুসরণ না করার ঘটনা হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা।
সমালোচকদের মতে, দুটি পথের একটি সত্য হতে পারে — হয় সৌদি সরকার দূতাবাসকে অবহিত করার প্রয়োজন বোধ করেনি, যাকে তাঁরা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ হিসেবে দেখছেন; নয়তো সৌদি সরকার দূতাবাসকে জানিয়েছিল, কিন্তু দূতাবাস যথাসময়ে উদ্যোগ নেয়নি, যা হলে তা হবে দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতা। কোনটি ঘটেছে, তা স্পষ্ট করা এখন ঢাকার দায়িত্ব বলেই তাঁদের মত।
ঘটনাটি বড় প্রশ্ন তুলেছে দেশের দুটি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও। প্রবাসীদের অবদান মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য দেশে রয়েছে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়; শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই রয়েছেন তিনজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। সেই কাঠামোর মধ্যেই দুজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে গেছে মন্ত্রণালয়গুলোর অজান্তে — জনমনে তাই প্রশ্ন জেগেছে, সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক আসলে কেমন।
প্রসঙ্গটি আরও বিতর্কিত হয়েছে এক প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রীকে এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলতে শোনা গেছে, সৌদির এই ঘটনাটি সেখানে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি 'শিক্ষা' হয়ে থাকবে। তাঁর এই কথা নিয়ে ইতিমধ্যে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন — শিক্ষা আসলে কে পেল এই ঘটনায়: সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা, নাকি বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়?
বিতর্কের পেছনে রয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। এই শ্রমিকদের পাঠানো অর্থেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স-অস্তিত্ব টিকে আছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী ও পুরুষ শ্রমিক বিদেশে যান, তাঁদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন বলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সৌদির বাসাবাড়িতে কাজ করা নারীদের অনেকেই নিত্য যৌন নিপীড়নের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে; এমনকি নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনাও ঘটে। অনেকে বলেছেন, সৌদি পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা তেমন উদ্যোগ নেয় না, উপরন্তু মালিকের কাছেই অভিযোগকারীকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আবার কোনো কোনো নারী দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে যে পেশার কথা বলে তাঁদের নেওয়া হয়, সেই পেশায় আর নিয়োজিত হতে পারেন না। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের লাশ হয়ে দেশে ফেরার গল্পটাও ছোট নয়।
প্রশ্ন তাই এখন সুনির্দিষ্ট: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা দূতাবাসের কী কী কার্যক্রম রয়েছে এই রেমিট্যান্স-যোদ্ধাদের জীবন সুরক্ষার জন্য; তাঁদের বিস্তারিত তথ্য, অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না; আর কর্মরত দেশটিতে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি আদায়ের কোনো উপায় আছে কি না।
অপরাধের শাস্তি হবে — এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই, তা সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু অপরাধটা কী, আদৌ তা অপরাধ কি না, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে কি না — এসব প্রশ্ন এখন তীব্রভাবে সামনে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি কীভাবে দেখে, তার ওপরই নির্ভর করছে সৌদিতে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মর্যাদা, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




