নির্বাচনের আগে বেলগ্রেডে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দেড় লাখ মানুষের মহাসমাবেশ, চাপে ভুচিচের দল
সার্বিয়ায় রোববারের গুরুত্বপূর্ণ সংসদ নির্বাচনের আগে বৃহস্পতিবার রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রে বিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থনে প্রায় দেড় লাখ মানুষ সমবেত হয়েছেন। এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের দলকে ভোটে পরাজিত করা।
‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামের এই আন্দোলন নেতৃত্বহীন কাঠামোয় শিক্ষার্থীদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, রোববারের ভোটের মাধ্যমে ভুচিচের ডানপন্থী জনতুষ্টবাদী সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) ১৪ বছরের বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।
নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী বলেছে, এবারের নির্বাচনী প্রচার ভয়ভীতি, গ্রেপ্তার ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারে কলঙ্কিত হয়েছে। ভোটের পরিবেশ নিয়ে এই অভিযোগগুলো সমাবেশেও বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
সমাবেশে যোগ দিতে আসা ৪৭ বছর বয়সী মারিয়া নেদেলকোভিচ রাদিচ বলেন, তিনি স্টুডেন্ট লিস্টকে সমর্থন করতে এসেছেন, কারণ তরুণেরাই অবশেষে তাঁকে আশা দিয়েছে যে একটি স্বাভাবিক দেশে বসবাস করা সম্ভব। তাঁর ভাষায়, জীবনে এই প্রথম তিনি বিশ্বাস করছেন যে সেটা সত্যিই সম্ভব।
রোববারের এই ভোটের পেছনে রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ। ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলস্টেশনের নতুন করে সংস্কার করা একটি ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।
ওই দুর্ঘটনার জন্য ব্যাপকভাবে দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। ঘটনাটি ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর থেকে সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় বিক্ষোভগুলোর জন্ম দেয়।
দুর্ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবি থেকে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী এই আন্দোলন ধীরে ধীরে আগাম নির্বাচনের দাবিতে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে আগাম ভোটের পথে যেতে বাধ্য করে।
বৃহস্পতিবারের সমাবেশে ‘শিক্ষার্থীরাই জিতছে’ লেখা পতাকা নেড়ে, স্লোগান দিয়ে ও বাঁশি বাজিয়ে শিক্ষার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা বেলগ্রেডজুড়ে মিছিল করেন। মিছিল শেষে সবাই স্লাভিয়া স্কয়ারে জড়ো হন — যে চত্বরটি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কিছু সমাবেশের সাক্ষী।
জনসমাগম পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংগঠন আর্কাইভ অব পাবলিক গ্যাদারিংসের হিসাবে সমাবেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। স্টুডেন্ট লিস্টের ২৫০ প্রার্থীর একজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যুগোস্লাভ গাসিচ জনতাকে বলেন, তাঁরা ১৪ বছরের অপমান, বিশৃঙ্খলা ও বিশ্বাসঘাতকতার অবসান ঘটাচ্ছেন; তখন জনতা ‘জয়, জয়’ বলে স্লোগান দেয়। গাসিচ আরও বলেন, জনগণ আরও ভালো কিছুর যোগ্য এবং শিক্ষার্থীরাই জিতছে।
অন্যদিকে ভুচিচ এক দশকের বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছেন — কখনো প্রধানমন্ত্রী, কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে গত মাসে তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন; ২০১২ সালে তাঁর দল ক্ষমতায় আসার পর এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি ক্রীড়া হলে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণে ভুচিচ শিক্ষার্থী আন্দোলনকে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত অভ্যুত্থানচেষ্টা বলে অভিযোগ করেন — এই অভিযোগ তিনি নিয়মিতই করে আসছেন। তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, কীভাবে তাঁরা রাষ্ট্রকে ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল তা কখনো ভোলা যাবে না, রাষ্ট্রকে সবসময় রক্ষা করতে হবে; আর ভোটে গিয়ে প্রতিপক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার আহ্বান জানান। সে সময় সাদা কাগজের ফালি ও বেলুনে ভরে ওঠে হলঘর।
২৫০ আসনের সংসদের জন্য স্টুডেন্ট লিস্টের ২৫০ প্রার্থীর অনেকেই শিক্ষাজগৎ থেকে এসেছেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনীতির বাইরের মানুষ। আন্দোলনটির কর্মসূচি বিস্তৃত হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার।
সার্বিয়ায় নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন জনমত জরিপের অভাব রয়েছে, আর যেসব জরিপ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর ফলাফলে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। ফলে রোববারের ভোটের ফল কোন দিকে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ভোটের কয়েক দিন আগে সার্বিয়ার নাগরিক সমাজের গোষ্ঠীগুলো সতর্ক করেছে যে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের’ পরিবেশ অনুপস্থিত। বুধবার বেলগ্রেডের প্রসিকিউটররা নির্বাচনের দিন ‘সহিংসতা, দাঙ্গা ও হামলার’ ষড়যন্ত্রের সন্দেহে গ্রেপ্তার ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে হুমকি ও ভয়ভীতির খবর বেড়েছে, তবে আন্দোলন শুরুর পর থেকে তাঁদের সমাবেশগুলো মূলত শান্তিপূর্ণই থেকেছে। সমাবেশে আসা ৩৫ বছর বয়সী ইগর বলেন, তিনি শুরু থেকেই এই লড়াই অনুসরণ করছেন; এটাই শেষ সমাবেশ, সবাই মিলে ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা দেওয়া জরুরি, আর ২৫ তারিখে ভোটকেন্দ্রে সবার সঙ্গে দেখা হবে।
সব মিলিয়ে রোববারের ভোট শুধু একটি সংসদ নির্বাচন নয় — দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর।






