নিউইয়র্কে ঘোড়ার গাড়ির যুগ শেষের পথে: ২০২৮ সাল থেকে নিষিদ্ধ হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী যান
নিউইয়র্ক শহরের অন্যতম পরিচিত দৃশ্য ঘোড়ার গাড়ি দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইতিহাস হয়ে যেতে চলেছে। বৃহস্পতিবার শহরের নেতারা এই প্রথা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। গত গ্রীষ্মে সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার সময় ১৮ বছর বয়সী এক পর্যটকের মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্ত এলো।
সিটি কাউন্সিলে ‘রোমাঞ্চ আইন’ নামের প্রস্তাবটি ৪০–৭ ভোটে পাস হয়েছে, দুজন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। এই আইনে ঘোড়ার গাড়ি চালানোর জন্য নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ হবে এবং ২০২৮ সালের ১ জুনের মধ্যে ধাপে ধাপে সব গাড়ি তুলে নেওয়া হবে। ভোটের ব্যবধান এমন যে এটি ভেটো-নিরোধী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, কাজ হারানো ঘোড়াগুলোকে কসাইখানায় বিক্রি করা যাবে না। অর্থাৎ গাড়ি বন্ধ হওয়ার পর ঘোড়াগুলোর ভাগ্যে কী ঘটবে, সে বিষয়েও সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পেছনের সবচেয়ে বড় ঘটনা রোমাঞ্চ মাহাজানের মৃত্যু। ১৮ বছর বয়সী এই ভারতীয় পর্যটক গ্রীষ্মে সেন্ট্রাল পার্কে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাড়িতে থাকা অবস্থায় ঘোড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিহত হন। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িটি আরেকটি গাড়ির চাকায় ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। ভোটের দিন মাহাজানের খালা ও চাচা কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন।
সেন্ট্রাল পার্ক পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল পার্ক কনজারভেন্সি বলেছে, মাহাজানের মৃত্যু ছিল মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি সংক্রান্ত নবম ঘটনা — এমন সংখ্যা উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তারা উপেক্ষা করতে পারেনি। সংস্থাটি বহু বছর ধরে এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ছিল এবং সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে।
অতীতেও পর্যটক ও পার্কে ঘোরাফেরা করা মানুষ ঘোড়া ছুটে গেলে আহত হয়েছেন। জানুয়ারির একটি ঘটনায় একটি ঘোড়া গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পশু অধিকার গোষ্ঠী ও পার্কের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনার কথা বলে নিষেধাজ্ঞা দাবি করে আসছিলেন; বৃহস্পতিবারের ভোটে তাঁরাও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ভোটের আগে সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন বলেন, ঘোড়ার গাড়ি এখন নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বছরে চার কোটি ২০ লাখ মানুষ আসেন এমন এলাকায় রেকর্ড গরমের মধ্যে এক হাজার পাউন্ডের গাড়ি টানার জায়গা এটি নয়।
এর আগের দুই মেয়র বিল ডি ব্লাসিও ও এরিক অ্যাডামসও নিজেদের মেয়াদে নিষেধাজ্ঞার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তখন সিটি কাউন্সিলে যথেষ্ট সমর্থন মেলেনি। এবার গ্রীষ্মের প্রাণঘাতী ঘটনার পর আলোচনা আবার জোরালো হয় এবং শেষ পর্যন্ত কাউন্সিল বড় ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস করে।
আইনে গাড়িচালকদের জন্য একটি ‘কর্মশক্তি উত্তরণ কর্মসূচি’ রাখার কথা বলা হয়েছে। চালকেরা ইউনিয়নভুক্ত; এই কর্মসূচিতে চাকরি খুঁজে দেওয়া, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার পরামর্শ ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে বলে বিলে উল্লেখ আছে।
তবে চালকদের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি এসেছে। প্রায় ১৫০ জন ঘোড়ার গাড়িচালকের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার সিটি হলের বাইরে বিক্ষোভ করেছে এবং আগের দিনই শহরের আইন বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, কালি শুকানোর মিনিটেই তারা সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আদেশ চাইবে।
ভোটের পর ইউনিয়নের স্থানীয় ১০০ শাখার প্রশাসনিক সহসভাপতি আলেকজান্ডার কেম্প বলেন, তারা আদালতে যাবেন। তাঁর ভাষায়, এই বিল স্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক, এটি কাজের বিকল্পের কোনো বাস্তব ব্যবস্থা নয় — শুধু একটি পরিকল্পনা তৈরির পরিকল্পনা; শত শত কর্মী, গাড়ির মালিক ও তাদের পরিবারের সামনে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ধ্বংস ছাড়া বাস্তব কিছু নেই।
ফলে ভোটে নিষেধাজ্ঞা পাস হলেও লড়াই শেষ হয়নি। একদিকে ২০২৮ সালের ১ জুন থেকে কার্যকরের সময়সীমা, অন্যদিকে ইউনিয়নের আদালতে যাওয়ার ঘোষণা — আগামী দিনে আইনি লড়াইয়েই ঠিক হবে নিউইয়র্কের ঘোড়ার গাড়ির চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ।






