যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ চারজন নিহত, ফের দুর্ভিক্ষের সতর্কবার্তা
গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুসহ চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ছিটমহলটির ভেতরে ইসরায়েলি সেনারা আরও ভূখণ্ড দখল করে নেওয়ার মধ্যেই এই প্রাণহানির খবর এল, আর একই সঙ্গে একটি মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে—পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলি বিধিনিষেধে বাসিন্দারা খাবার জোগাড়ে হিমশিম খাওয়ায় গাজা আবার দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে পারে।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের নিহতদের মধ্যে রয়েছে উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের কাছে ইসরায়েলি গুলিতে প্রাণ হারানো এক অল্পবয়সী মেয়ে।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি গাড়িতে হামলায় একজন নিহত ও আরেকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। পৃথক আরেকটি হামলায় দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে সাইকেলে থাকা এক ব্যক্তি নিহত হন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার চতুর্থ আরেকজন মারা গেছেন আগের কোনো ইসরায়েলি হামলায় পাওয়া আঘাতের কারণে।
প্রাণঘাতী হামলার পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনারা গাজার ভেতরে আরও জমি দখল করে চলেছে। সংকুচিত হয়ে আসা এই ভূখণ্ডে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস করেন, আর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার টন ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনা।
মাহমুদ ব্যাখ্যা করেছেন, ইসরায়েল গাজার ভেতরে তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করছে—'যুদ্ধবিরতির' পর থেকে তারা আরও ভূমি দখল করছে, উত্তর গাজা থেকে ভেতরের দিকে, মাঝখানে ও পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে। তার ভাষ্য, মানুষ তাদের ঘরে ফিরতে পারছেন না, আর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোর বেশির ভাগ ভবনই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
আল জাজিরার মানচিত্র অনুযায়ী, গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে কিংবা প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে 'যুদ্ধবিরতি' কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫৩৮ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৫ হাজার ৪৯৮ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েল ৭৪ হাজার ৪০০-র বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।
মারাত্মক এই হামলার পাশাপাশি গাজাজুড়ে ফিলিস্তিনিরা বাড়তে থাকা খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। ইসরায়েলের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমে তীব্র অর্থসংকট এই সংকটকে নতুন করে ঘনীভূত করেছে।
জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর বৃহস্পতিবার বলেছে, তাদের দলগুলো ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাওয়া বাজার ও আকাশছোঁয়া খাদ্যমূল্য লক্ষ্য করেছে, এবং সতর্ক করেছে গাজা আবার দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। সংগঠনটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ইচ্ছাকৃতভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ স্থগিত করার পর ১৯ অক্টোবর কিছু আমদানি আবার চালুর ঘোষণা দেয়। তবে সংগঠনটি বলছে, সেই সিদ্ধান্তে তেমন স্বস্তি আসেনি—চালানগুলো এখনো ব্যাপকভাবে সীমিত এবং তাজা ফল ও সবজির প্রবেশ বন্ধ রয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এই সপ্তাহে জানিয়েছে, তীব্র অর্থসংকটে তারা গাজায় খাদ্য সহায়তা এক-তৃতীয়াংশ কমাতে বাধ্য হয়েছে; ফলে শীত এগিয়ে আসার মুখে আনুমানিক ৫ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দা অপরিহার্য মাসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জাতিসংঘের মতে, বাণিজ্যিক প্রবেশপথ ও ত্রাণ ক্রসিংয়ে ইসরায়েলি বিধিনিষেধে তাজা খাবার ও মৌলিক নিত্যপণ্যের সরবরাহ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেছে।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার মারাম হুমাইদ বর্ণনা করেছেন, কীভাবে হঠাৎ ও নাটকীয়ভাবে মৌলিক খাবার অদৃশ্য হয়ে গেছে—বাজার ফাঁকা, পরিবারগুলো ক্রমশ মরিয়া। তার ভাষ্য, 'খাবার হঠাৎ উধাও—সবজি নেই, ফল নেই, মাংস নেই, ডিম নেই, রুটি নেই—দাম আকাশছোঁয়া। আজ দুপুর পর্যন্ত আমাদের নাশতা হয়নি; আমার স্বামী ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজে কয়েকটি রুটি নিয়ে ফিরেছেন। আমরা আবার টিনজাত শিমে ফিরে গেছি।'
ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছিটমহলটিতে বিদ্যুৎ বা সচল ফ্রিজ না থাকায়, খাবার মিললেও পরিবারগুলো তাজা পণ্য সংরক্ষণ করতে পারে না। হুমাইদ বলেছেন, এবার মজুত করার সুযোগও সীমিত—ঘাটতি শুরু হয়েছে আটা ও তাজা পণ্য দিয়ে, যা বেশিদিন রাখা যায় না; অন্য পণ্যের দাম বেড়েছে, কিন্তু অনেকে মজুত করার সামর্থ্যই রাখেন না, আবার অনেকে ক্লান্ত ও হতাশ। শারীরিক অভাবের পাশাপাশি উপচে পড়া দোকানে কমতে থাকা মজুতের মধ্যে ঘোরাফেরা করা বাসিন্দাদের মানসিক চাপও চরমে পৌঁছেছে—প্রতিটি খাবারের দিকে তারা এমনভাবে তাকাচ্ছেন, যেন এটাই শেষবারের মতো দেখা। যুদ্ধবিরতির কাগুজে ঘোষণা আর মাঠের এই বাস্তবতার ফারাকই এখন গাজার প্রতিদিনের ছবি।



