অভিবাসন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য: দুই ফেডারেল বিচারককে মামলা থেকে সরাতে চায় মার্কিন বিচার বিভাগ
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযান নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা মিনেসোটার দুই ফেডারেল বিচারককে অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে দেশটির বিচার বিভাগ (ডিওজে)। বিচারকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পৃথক দুটি আবেদন করেছে বিভাগটি।
বিচারক দুজন হলেন প্যাট্রিক শিল্টজ ও জন টুনহাইম। তারা নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ নামের অভিবাসন অভিযানের সমালোচনা করেছিলেন।
শিল্টজের আদালতে চলছে সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া সালাহ ওসমান আহমেদের মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলে বিচার বিভাগের উদ্যোগের মামলা। আহমেদ ২০০৯ সালে আল-শাবাবে যোগ দিয়ে সন্ত্রাসীদের বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন।
টুনহাইমের আদালতে চলছে এক দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিকের বিচার, যার বিরুদ্ধে মিথ্যাভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব দাবি করা এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিচার বিভাগ পৃথক আবেদনে বলেছে, অপারেশন মেট্রো সার্জের সমালোচনা করে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে অংশ নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই দুই বিচারক মামলা দুটিতে ন্যায্যভাবে বিচার করতে পারবেন কি না।
এ সপ্তাহে এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিচার বিভাগ বলেছে, জাতির বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারক শিল্টজ ও টুনহাইমের রেকর্ডভুক্ত অংশগ্রহণ এবং শিল্টজের পরবর্তী প্রকাশ্য মন্তব্য নিঃসন্দেহে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
শিল্টজ ও টুনহাইম ছিলেন সাতজন মিনেসোটা ফেডারেল বিচারকের একজন করে, যারা সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে অপারেশন মেট্রো সার্জ নিয়ে কথা বলেছিলেন। শিল্টজ প্রায় ৯০ মিনিটের সাক্ষাৎকারে প্রশাসনের এই অভিযান পরিচালনাকে ‘আইনের শাসনের প্রতি গুরুতর হুমকি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। টুনহাইম পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, অভিবাসন অভিযানে যুক্ত এজেন্টরা মূলত বিপজ্জনক অপরাধীদেরই গ্রেপ্তার করছেন না।
গত মাসে বিচার বিভাগ শিল্টজ, টুনহাইমসহ টাইমসের প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া অন্য মিনেসোটা বিচারকদের বিরুদ্ধে বিচারিক অসদাচরণের অভিযোগ দায়ের করে। বিচারিক নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে অষ্টম সার্কিটকে তদন্তের অনুরোধও করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, তাদের আচরণ মিনেসোটায় নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে।
টাইমসের প্রতিবেদনটিতে উঠে আসে, অভিবাসন মামলার বিশাল চাপ সামলাতে মিনেসোটার বিচারকেরা নিয়মিত বৈঠক করতেন, চলমান ইমেইল থ্রেডে যোগাযোগ রাখতেন এবং পুনরাবৃত্ত আইনি প্রশ্নে পরামর্শের জন্য বিচারক খুঁজতে আদালতের কেরানিদের তৈরি একটি অনানুষ্ঠানিক স্প্রেডশিট ব্যবহার করতেন। প্রধান বিচারক এরিক টোস্ট্রুড অবশ্য বলেছিলেন, প্রতিটি মামলায় প্রত্যেক বিচারক স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সহযোগী অ্যাটর্নি জেনারেল স্ট্যানলি উডওয়ার্ড লিখেছেন, অভিবাসন প্রয়োগের মতো রাজনৈতিক বিষয়ে যে বিচারক প্রকাশ্যে পক্ষ নিয়েছেন, তিনি বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ—ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব বাতিলের প্রচেষ্টা—সংক্রান্ত মামলার সভাপতিত্ব করতে পারেন না।
শিল্টজ অবশ্য নতুন এই সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সেপ্টেম্বরে তিনি বলেছিলেন, তার সরে দাঁড়ানোর কোনো ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো নির্দিষ্ট মামলার মেরিট নিয়ে কোথাও মন্তব্য করেননি; তিনি আইনের শাসনের পক্ষে কথা বলেছেন, যার একটি অংশ হলো আদালতের আদেশ মানা—এটি সরে দাঁড়ানোর কারণ হতে পারে না। টুনহাইম মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ আইনি ফেলো চার্লস ‘কুলি’ স্টিমসন বলেছেন, বিচারকেরা সাধারণত তাদের আদালতের মামলার সঙ্গে জড়াতে পারে এমন বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়িয়ে চলেন। তার মতে, এই বিচারকেরা সংবাদপত্রের সঙ্গে কথা বলে ‘অসাধারণ অসতর্ক’ কাজ করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, সরে দাঁড়ানোর আবেদনে বিচারকদের কার্যত নিজেদের নিরপেক্ষতার বিচারক হতে হয়, আর পূর্ণ রেকর্ড না দেখে আবেদনের ফল বলা ঠিক হবে না।
কোনো বিচারক আবেদন খারিজ করলে সরকার অষ্টম সার্কিটে পর্যালোচনা চাইতে পারবে, যেখানে তিন বিচারকের প্যানেল ঠিক করবে সরে দাঁড়ানোর আইনি মানদণ্ড পূরণ হয়েছে কি না। বিচার বিভাগ বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য বিবৃতির বাইরে আর মন্তব্য করেনি, আবেদন খারিজ হলে আপিল করা হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও দেয়নি। এখন দেখার বিষয়, বিচারক দুজন নিজেরাই সরে দাঁড়ান, নাকি লড়াইটা উঠে যায় আপিল আদালতে।






