নিরাপত্তা না পাওয়ার ক্ষোভ নিয়ে সরাইল থানায় এমপি রুমিন ফারহানা, ওসির সঙ্গে তুমুল বাকবিতণ্ডায় উত্তেজনা
দুর্গাপূজায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না পাওয়া এবং সৌজন্যমূলক আচরণ না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। থানার কক্ষে দুজনের তুমুল বাকবিতণ্ডা ও বাইরে সমর্থকদের স্লোগানে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে সরাইল থানায় ওসির কক্ষে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় ওসিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন।’
ওসির বিরুদ্ধে তিনি ঘুষ-দুর্নীতি, মাটি কাটা ও বালু ব্যবসা থেকে অর্থ নেওয়া এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করার অভিযোগ তোলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি।
থানার কক্ষে রুমিন ফারহানাকে বলতে শোনা যায়, তিনি একাধিকবার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অনুরোধ করেছেন। বিজয়নগর ও আশুগঞ্জে তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হলেও সরাইলে তা পাননি। তাঁর দাবি, নির্বাচিত সংসদ সদস্য নিরাপত্তা চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে তা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘কতবার রিকোয়েস্ট করেছি যে নিরাপত্তা দেওয়া হোক। আমাকে বিজয়নগরে নিরাপত্তা দিয়েছে, আমাকে আশুগঞ্জে নিরাপত্তা দিয়েছে। ওইটা আইন আছে যে নির্বাচিত এমপি নিরাপত্তা চাইলে লোকাল এরিয়াতে হবে। গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগের সময় একজন এমপি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এবং উনি মারা যাওয়ার পর এই আইনটা হয়।’
ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘উনি আমার লোকের ফোনই ধরেন না এবং বলেন, উনি নির্বাচিত এমপি, ওনার নিরাপত্তা মানুষ দেবে। তো এ জন্যই মানুষ যা দেখতেছেন, বাইরে আরও ৫-১০ হাজার মানুষ আছে। তো ওরা আমার নিরাপত্তা দিচ্ছে। আমার তো নিরাপত্তা লাগবে, তাই না? সো মানুষ আমার নিরাপত্তা দিচ্ছে।’
রুমিন ফারহানার দাবি, ওসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মাটি কাটা, বালু ও ইটভাটাসংশ্লিষ্ট ব্যবসা থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এলাকাটি দাঙ্গাপ্রবণ; কোনো ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় বলেও তাঁর অভিযোগ। এসব বিষয়ে জানতেই তিনি থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে ওসির এমন আচরণ করা উচিত হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সরাইল থানার ওসি মোহাম্মদ মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, ‘সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা থানায় এক থেকে দেড়শ লোক নিয়ে এসে হইচই করেন এবং আমার কার্যালয়ে কয়েকশ লোক ঢুকে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।’
ওসি বলেন, ‘উনি কিছু লোককে শিখিয়ে নিয়ে আসছেন যে, আমার বিরুদ্ধে আজেবাজে কথাবার্তা বলছে, যা আমি প্র্যাকটিস করি না। উনি বলছেন, আমি নাকি কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে গিয়ে ভাত খেয়ে আসছি। আমি কখনও কারও দাওয়াতেই যাই না। বিয়ের দাওয়াতেও যাই না। রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম ছাড়া কোনো খাবারদাবার, খানাপিনায় অ্যাটেন্ড করি না। শুধু সরকারি প্রোগ্রাম, যেখানে ইউএনও মহোদয় থাকেন, আমি থাকি, ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন, তখন আমি যাই।’
মামলার আসামি ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন ওসি। তিনি বলেন, ‘উনি লোক সাজিয়ে নিয়ে আসছেন। সে বলছে, আমাকে নাকি মামলার আসামি ছাড়ার ব্যাপারে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছে। লোকটাকে আমি কখনও দেখছি বলে আমার মনে পড়ে না। আসামিরা আসে, অফিসারেরা ধরে হাজতে পাঠায়, আবার কোর্টে চলে যায়। আমার সঙ্গে ইন্টারোগেশনে কোনো প্রয়োজনই হয় না।’
ইটভাটা থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘উনি বলছেন, ব্রিকফিল্ড থেকে টাকা নিই। ব্রিকফিল্ড এখানে হাওর অঞ্চল, সবগুলো পানির নিচে ডুবানো। উনি এই অভিযোগটা কোত্থেকে আনলেন?’
পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ওসি বলেন, দুর্গাপূজায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল এবং থানা এলাকার সব পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চাওয়ার বিষয়টি আলাদা; এ জন্য তিনি পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করতে পারেন। গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর পক্ষে একটা টিম ওইভাবে এনগেজ রাখা সম্ভব ছিল না বলেও জানান ওসি।
ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া আরও অভিযোগ করেন, রুমিন ফারহানা অনুসারীদের নিয়ে থানার কক্ষে এসে তাঁকে অবরুদ্ধ করেন এবং থানার বাইরে মিছিল করেন। থানায় আসা অনেককেই তিনি চিনতে পারেননি। তাঁর দাবি, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো সংগঠনের লোকজনকে গ্রেপ্তার না করার জন্য সংসদ সদস্য তাঁকে প্রায়ই চাপ দেন। জবাবে রুমিন ফারহানা ওসিকে বলেন, আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন, আমরা সব জানি; এখন আসছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংগঠনের লোক চেনাতে।
এ সময় ওসির সঙ্গে রুমিন ফারহানার সমর্থকদের তর্কে জড়ানোর ঘটনা ঘটে। কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করে রাখার জন্য থানার সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন ওসি। তিনি বলেন, থানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিষয়টি তিনি নোট করে রেখেছেন। রুমিন ফারহানা থানায় অবস্থানকালে বাইরে তাঁর পক্ষে এবং ওসির বিরুদ্ধে কয়েক শ মানুষকে স্লোগান দিতে দেখা যায়; এ ঘটনায় থানা ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরবর্তী পরিণতি কী হয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।




