পুতিনকে ‘মানবতাবাদী’ বললেন ট্রাম্পের দূত উইটকফ, দুই দলেই সমালোচনা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘মানবতাবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকদের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পুতিনকে ‘নির্মম’, ‘খুনে স্বৈরশাসক’ ও ‘দুর্বৃত্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। চার বছর পর ট্রাম্পের দূতের মুখে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা গেল।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের ঐতিহাসিক কনস্ট্যান্টাইন প্রাসাদে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় এই মন্তব্য করেন উইটকফ। এর আগে ২০২২ সাল থেকে আটক থাকা ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয় রাশিয়া।
বৈঠকে পুতিনের উদ্দেশে উইটকফ বলেন, ‘আপনারা প্রায়ই আমার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মানবতাবাদী বলে থাকেন। আপনিও একজন মানবতাবাদী, মহাশয়। আমি আপনাকে অভিবাদন জানাই, আপনার প্রশংসা করি এবং আবারও ধন্যবাদ জানাই।’
তাঁর এই বক্তব্যে সমালোচনা এসেছে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টি থেকেও। রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘না। পুতিন একজন নির্মম খুনি।’ আরেক রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস মন্তব্য করেন—উইটকফের বক্তব্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও আপত্তিকর।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন অবস্থানকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতার একাধিক ইঙ্গিত মিলেছে।
গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প রুশ ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের একটি চুক্তির ঘোষণা দেন। জ্বালানির দাম কমানোর পাশাপাশি ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করাও তাঁর লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
১৬ অক্টোবর রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ শিথিল করেন ট্রাম্প। সমালোচকদের মতে, এ পদক্ষেপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে মস্কোর অতিরিক্ত ৩০ কোটি থেকে ৭০ কোটি ডলার আয় হতে পারে, যার একটি বড় অংশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করছেন।
২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার প্রতি তাঁর অনুকূল মনোভাব নিয়ে বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি তিনি বলেন, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া তেমন কিছু করছে না। অথচ ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, একই দিনে রুশ ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ ছয়জন নিহত হন।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কির প্রতি ট্রাম্পের সমালোচনা বেড়েছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ বন্ধে এখনই সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ‘একটি চুক্তি করার সময় এসেছে। আমরা ইউক্রেনকে অনেক কিছু দিয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে একেবারেই কিছু পাইনি।’
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রুশ সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ড্রোন যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং আধুনিক অস্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে পেন্টাগনের ধারণা আরও স্পষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থান ও অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এই সহায়তা ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তি এনে দিতে পারে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পুতিনের প্রতিশ্রুতির ওপর ট্রাম্পের আস্থা এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।






