বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার, আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো ও তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলা, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সপ্তাহজুড়েই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এই উচ্চমূল্যের আশপাশে অবস্থান করছে। গত মঙ্গলবার দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ৭৫ ডলারে উঠেছিল। অর্থাৎ বর্তমান দাম কেবল এক দিনের উত্থান নয়—টানা উচ্চ পর্যায়ে থাকা এই দরই বাজারের অস্থিরতার গভীরতা বোঝাচ্ছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর পর্যন্ত গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ফলে অঞ্চলটিতে জাহাজভাড়া ও বিমার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এতে তেল উত্তোলন, জাহাজে পরিবহন এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
উচ্চমূল্য ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাতের প্রভাব, উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্থরতার কারণে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে বিশ্বে তেলের দৈনিক চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে, আর পুরো বছরজুড়ে গড় চাহিদা কমতে পারে প্রায় ২৬ লাখ ব্যারেল।
বিপরীতে চলতি বছর বৈশ্বিক বার্ষিক তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসেই বিশ্বে তেলের বাণিজ্যিক মজুত এক কোটি ব্যারেল কমেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কম। মজুতের এই বড় পতন সরবরাহের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকলেও অর্থনৈতিক শ্লথগতির কারণে জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে দামের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা সীমিত থাকবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। অর্থাৎ একদিকে সরবরাহের সংকট দাম ওপরে ঠেলছে, অন্যদিকে চাহিদার দুর্বলতা সেই গতি কিছুটা আটকে রাখছে—এই টানাপোড়েনেই এখন বিশ্ব জ্বালানি বাজার।
বিশ্ববাজারে তেলের এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।
দেশে প্রতি মাসের শুরুতে সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে থাকে, ফলে বিশ্ববাজারের দামের তাৎক্ষণিক প্রতিফলন ঘটে না। তবে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেলে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়াতে হতে পারে। সেই সম্ভাবনাই এখন আমদানিকারক থেকে সাধারণ ভোক্তা—সবার হিসাব বদলে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষির সেচ, গণপরিবহন এবং শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় একযোগে বেড়ে যাবে। আর তা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেশের বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের দামের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত এসে লাগতে পারে প্রতিটি পরিবারের মাসের খরচে।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তার মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যার কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা কোনো ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
সেলিম রায়হানের মতে, এর ফলে বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদে আটকে পড়ার মুখে পড়েছে। বিদ্যমান সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, সে বিষয়ে সরকারের নীতিগত রূপরেখায় স্পষ্টতার ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতির এই অস্পষ্টতাই বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাকে সবচেয়ে বেশি আটকে দিচ্ছে বলে তার মত।
সরকার বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে যে জোর দিচ্ছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অতীতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এই অর্থনীতিবিদ। এ ক্ষেত্রে অবিলম্বে সমন্বিত ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতি গ্রহণের তাগিদ দেন তিনি। বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়, রিজার্ভ আর মূল্যস্ফীতির আগামী দিনের হিসাব।




