অ্যারিজোনায় ঝড়-টর্নেডোর তাণ্ডব: গলফ বলের আকারের শিলাবৃষ্টি, উপড়ে পড়ল গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে ভয়াবহ ঝড়ের তাণ্ডবে গাছ উপড়ে বাড়ির ওপর পড়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে এবং গলফ বলের আকারের শিলাবৃষ্টি আঘাত হেনেছে। বুধবার রাতভর চলা এই ঝড় বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত মধ্য অ্যারিজোনাজুড়ে বজ্রপাত আর প্রবল বাতাস বয়ে নিয়ে গেছে, আর একটি সম্ভাব্য টর্নেডো একটি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
জাতীয় আবহাওয়া সেবা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে মধ্য অ্যারিজোনা দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়গুলো শিলাবৃষ্টি ও বাতাসে ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে। কিছু এলাকায় বন্যা সতর্কতা জারি ছিল, পাশাপাশি টর্নেডোর সম্ভাবনাও ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ঝড় চলাকালে আবহাওয়া সেবা একের পর এক তীব্র বজ্রঝড়ের সতর্কবার্তা জারি করে।
বুধবার রাতে অঙ্গরাজ্যের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে গলফ বলের আকারের শিলা পড়েছে। সেই শিলাবৃষ্টি মানুষের বাড়ির ছাদে আঘাত করেছে, জানালা ভেঙেছে, গাড়িতে গর্ত তৈরি করেছে। সঙ্গে ছিল ক্ষয়ক্ষতি করার মতো প্রবল দমকা বাতাস, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
বুধবার রাতে ফিনিক্স থেকে প্রায় ১৪০ মাইল (২২৫ কিলোমিটার) উত্তর-পূর্বে নাভাজো কাউন্টির হিবার-ওভারগার্ড এলাকার ওপর দিয়ে একটি ঝড় বয়ে যাওয়ার সময় টর্নেডো সতর্কতা জারি ছিল। এলাকার মানুষজন উপড়ে পড়া গাছ আর বিধ্বস্ত কাঠামোর ছবি ও ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করেছেন। কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেখানে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি এবং সামান্য আহতের খবর পাওয়া গেছে। এলাকাটিতে প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসবাস।
কাউন্টির কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এলাকার রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি ওয়াল্ট ব্ল্যাকম্যান জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারগুলো বিদ্যুৎবিহীন রয়েছে, সম্পত্তির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে এবং অন্তত একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।’ এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, ঝড়ের পর এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবন কতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ঝড়টি আঘাত হানার সময় ওভারগার্ড ব্যাপটিস্ট চার্চের সদস্যরা প্রার্থনাসভা শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চার্চ বুধবার রাতে পোস্ট করে জানিয়েছে, ‘আমরা কিছু ক্ষতির শিকার হয়েছি, অনেক গাছ, সাইনবোর্ড, বেড়া আর কয়েকটি জানালা হারিয়েছি।’ তবে তাদের সদস্যরা সবাই ভালো আছেন। মজার ছলে চার্চটি আরও লিখেছে, ‘মহিলাদের বিশ্রামকক্ষে আমাদের দারুণ এক প্রার্থনাসভা হয়েছে’—আশ্রয় নেওয়ার সেই মুহূর্তের কথাই এতে ফুটে উঠেছে।
এমন ঝড় তৈরির পেছনের আবহাওয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফ্ল্যাগস্টাফের আবহাওয়া সেবার আবহাওয়াবিদ রায়ান বার্নহার্ট। তার ভাষ্য, উত্তর দিকে বয়ে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস ক্যালিফোর্নিয়া উপকূল থেকে আসা ঝড়গুলোকে শক্তি জোগায়। বাতাসের দিক বদলে গেলে সেগুলো ঘূর্ণি তৈরি করতে পারে, আর তাতেই টর্নেডো তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বার্নহার্ট বলেন, ‘বছরের এই সময়ে এই এলাকায় এমন ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক।’ ঋতুর এই সময়ে এমন তীব্র ঝড় ও সম্ভাব্য টর্নেডো স্থানীয়দের জন্যও অপ্রত্যাশিত ছিল—সে কারণেই প্রস্তুতির ঘাটতি আর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দুটোই বেশি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রবল বাতাসে ফ্ল্যাগস্টাফ ও মেসায় গাছ উপড়ে পড়েছে, যার কিছু পড়েছে দেয়াল আর গাড়ির ছাউনির ওপর। ফ্ল্যাগস্টাফের উত্তর-পশ্চিমে কোকোনিনো জাতীয় বনে ৩০ ফুটের (৯ মিটার) বেশি লম্বা কয়েক ডজন পন্ডেরোসা পাইন গাছ পড়ে গেছে। এত বড় ও শক্ত গাছ এভাবে উপড়ে যাওয়া ঝড়ের তীব্রতারই প্রমাণ।
বার্নহার্টের কথায়, ‘মাটিতে পড়ে থাকা এগুলো ছোট গাছ নয়। এগুলো বেশ শক্ত গাছ, যেগুলো উপড়ে গেছে।’ তার এই মন্তব্যেই পরিষ্কার, বাতাসের শক্তি কতটা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছিল যে দীর্ঘদিনের পুরোনো ও শক্ত পাইন গাছও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি।
ঝড়ের পর এলাকায় বিদ্যুৎবিহীন পরিবারগুলোর দুর্ভোগই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। ভাঙা খুঁটি মেরামত, উপড়ে পড়া গাছ সরানো আর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির হিসাব—সব মিলিয়ে পুনরুদ্ধারের কাজ সময়সাপেক্ষ হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ মঞ্জুর হলে সেই কাজে বাড়তি সহায়তা মিলতে পারে।
আবহাওয়া সেবার সতর্কতা অনুযায়ী, ঝড়ের ধারা ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের এখনো সতর্ক থাকতে হবে। একটি রাতের ঝড় কীভাবে পুরো একটি জনপদের জীবন এলোমেলো করে দিতে পারে, অ্যারিজোনার এই ঘটনা তারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে রইল।






