কক্সবাজার সৈকতে গোসলে নেমে মৃত্যু বেড়ে ৪, এখনো নিখোঁজ এক শিক্ষার্থী
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ মো. হারুন (২০) নামে আরও এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে রামু উপজেলার হিমছড়ির পেঁচারদ্বীপ সৈকত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। এ নিয়ে এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একজন।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য সকালে একজনের মরদেহ ভেসে আসার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার হওয়া চারজনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বলে জানান হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) সোলাইমান হোসেন।
বুধবার বিকেল ৫টার দিকে কক্সবাজার শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন হিমছড়ি মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে গোসলে নেমে তারা ভেসে যান। পুলিশ ও বিচকর্মীরা জানান, টানা ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে বুধবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসেন তিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। গোসলে নেমে তারা সাগরে তলিয়ে যান।
ঘটনার পরপরই দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। একই ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতরা হলেন — বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম (২৪) ও সাইবুল হক জিসান (২৩) এবং চট্টগ্রামের চাকরিজীবী মোহাম্মদ আকাশ (২১) ও মো. হারুন (২০)। নিখোঁজ শিক্ষার্থী এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড় (২৩)। এ ছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হওয়া রাকিব হাসান (১৯) নামে একজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
নিখোঁজ শিক্ষার্থীর খোঁজে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীরা অভিযান চালাচ্ছেন। সাগরে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব আলম জানান, গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার উত্তরা থেকে সাতবন্ধু বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে দুদিন ভ্রমণ শেষে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা কক্সবাজারে পৌঁছান। তারা হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপ জাদুঘরসংলগ্ন একটি রিসোর্টে ওঠেন।
তিনি জানান, দুপুরের খাবার শেষে বিকেল ৪টার দিকে সাতবন্ধু সমুদ্রে গোসলে নামেন। তাদের কেউই সাঁতার জানতেন না। এ সময় ওই এলাকায় আরও তিন-চারজন গোসলে ছিলেন। এ সময় দুজনকে পানিতে ডুবে যেতে দেখে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান সাতবন্ধু। একপর্যায়ে তারাও সমুদ্রের স্রোতের কবলে পড়ে ভেসে যেতে থাকেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন।
নিহতের স্বজনদের উদ্ধৃতি দিয়ে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সোলাইমান হোসেন জানান, সাইবুল হক জিসান ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মোকাররম হোসেনের ছেলে। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) বিবিএর শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিখোঁজ এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড় ঢাকার আজিমপুর এলাকার নাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। নিখোঁজ নিবিড়ের দুর্ঘটনার খবর জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজার রওনা হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার খালা শামীমা সুলতানা।
নিহত আকাশের সঙ্গে বেড়াতে আসা বন্ধু মোহাম্মদ সানি জানান, তারা চট্টগ্রামে একটি কারখানায় চাকরি করেন। পাঁচ বন্ধু মিলে বুধবার বেড়াতে কক্সবাজার এসেছিলেন। বিকেলে সাগরে গোসলে নামেন। হাঁটুপানিতে ছিলেন তারা, হঠাৎ বড় একটি ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। এ সময় তারা স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছিলেন। এ সময় পাশে থাকা সাতজনের কাছে সাহায্য চান তারা। এগিয়ে এসে তারাও ডুবতে থাকেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সানি বলেন, তখন সবাই হাবুডুব খাচ্ছিলাম। পায়ের নিচ থেকে বালু সরে যাচ্ছিল। কোনোমতে আমরা ৫-৬ জন তীরে উঠে আসি। তিন-চারজনকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার করি এবং দুজন ভেসে যায়।
এর আগে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে চলতি বছর ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এক পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। সৈকতে গোসলে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে কক্সবাজার শহরের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলীর তিন কিলোমিটার সৈকত ছাড়া আর কোথাও লাইফগার্ড সেবা নেই।
বিচকর্মীরা বলছেন, লাইফগার্ড সেবা না থাকা সৈকত অংশে গোসলে নামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যারা সাঁতার জানেন না, তাদের জন্য অরক্ষিত সৈকতে নামা মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। এই ঘটনায় নিহত সাত বন্ধুর কেউই সাঁতার জানতেন না।
ঘটনার পর কক্সবাজার সৈকতের অরক্ষিত অংশে পর্যটকদের নামতে নিষেধ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন পর্যটকদের সতর্ক করে বলেছে, লাইফগার্ড সেবা আছে এমন সৈকত ছাড়া সাগরে নামা যাবে না।
নিখোঁজ শিক্ষার্থী নিবিড়ের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীরা যৌথভাবে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।






