মেকেলেতে দোকানপাট খুললেও কাটেনি যুদ্ধের আতঙ্ক, বেতনহীন দিন কাটাচ্ছে টাইগ্রের মানুষ
ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলের রাজধানী মেকেলেতে ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে দোকানপাট, ব্যাংকগুলোও আবার সেবা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের মনে স্বস্তি ফেরেনি। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাঁদের আশঙ্কা, এ অঞ্চলের ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আবারও ভেস্তে যেতে পারে।
চলতি মাসের ৪ অক্টোবর ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনী ও তাদের মিত্র যোদ্ধারা আবার মেকেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অনিশ্চয়তা—চাকরি, শিক্ষা, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সাধারণ মানুষের।
টাইগ্রে এখনো ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চলা ভয়াবহ যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। ওই যুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীর সঙ্গে লড়েছিল অঞ্চলটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক আন্দোলন টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)। দুই বছরের সংঘাতে অঞ্চলটির অর্থনীতি ও জনজীবন প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এবারের নতুন লড়াই সেই পুরোনো ক্ষত আবার তাজা করে তুলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক সেবা ধীরে ধীরে চালু হলেও অনেক পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। বেতন পেতে দেরি হওয়ায় সরকারি কর্মচারীরা খাবার, বাসাভাড়া আর সন্তানদের স্কুলের খরচ জোগাতে পারছেন না। বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতে পরিবারগুলোর সঞ্চয়ও প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
মেকেলের সরকারি কর্মচারী গেবরেগজিয়াভের বলেন, ‘সবকিছু আবার চালু হলেও তার মানে এই নয় যে আমাদের সমস্যা শেষ হয়ে গেছে। প্রতিদিনই আমাদের খরচ আছে, কিন্তু বেতন ছাড়া আমরা কীভাবে চলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
অর্থসংকট পুরো সরকারি খাতকেই বিপর্যস্ত করেছে। গত মার্চে টাইগ্রের অন্তর্বর্তী প্রশাসন জানিয়েছিল, প্রত্যাশিত কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দ না আসায় তারা প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার সরকারি কর্মচারীর মাসিক বেতন দিতে পারছে না। এপ্রিলে আঞ্চলিক অর্থ দপ্তর জানায়, বেতন ও উন্নয়ন প্রকল্পে ৮৫০ কোটি বিরের তহবিলঘাটতি দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্যও এই অনিশ্চয়তা বড় ধাক্কা। আগের যুদ্ধে অনেকেই মূল্যবান পড়াশোনার সময় হারিয়েছেন। নতুন লড়াইয়ে তাঁদের ভয়, আবারও শিক্ষাজীবন ব্যাহত হবে, আরও পিছিয়ে পড়বেন তাঁরা।
আদিগ্রাত শহরের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শেউইত বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আমি ইতিমধ্যে অনেক সময় হারিয়েছি। আমাদের পড়াশোনা আবার ব্যাহত হলে আমি আরও একটি বছর হারাব এবং আরও পিছিয়ে পড়ব বলে ভয় পাই।’
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী টাইগ্রে ছেড়ে রাজধানী আদ্দিস আবাবায় গেছেন, যাতে অন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি নিতে পারেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় টাইগ্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সাময়িক ভর্তির ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ১৭–১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি ফিরে আসা শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন।
আকসুম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবেল বদলির আবেদন করতে আদ্দিস আবাবায় গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যেতে চাইনি, কিন্তু আমার পড়াশোনা এভাবে থামিয়েও রাখতে পারি না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি কি না, তা দেখতেই আদ্দিসে এসেছি। আমি শুধু যেটা শুরু করেছি, সেটা শেষ করতে চাই।’
এদিকে ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাছে সেনা চলাচল ও সৈন্য মোতায়েন নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবরে আশঙ্কা বাড়ছে যে লড়াই টাইগ্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ৮ অক্টোবর বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ইথিওপিয়া সরকারের মিত্র এক কমান্ডারের দাবির খবর দিয়েছে—ইরিত্রিয়ার সেনারা আদিগ্রাতে ঢুকেছে।
সব মিলিয়ে মেকেলের পুনরায় চালু হওয়া জনজীবন বাসিন্দাদের খুব সামান্যই স্বস্তি দিচ্ছে। নির্ভরযোগ্য আয় আর নিরাপত্তা ছাড়া দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ আবার বিস্তৃত হয় কি না, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে টাইগ্রের লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ।





