গোপনীয়তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার দায়ে মেটাকে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার জরিমানার আদেশ
ফেসবুকের গোপনীয়তা ও কনটেন্ট মডারেশন নীতি নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার দায়ে মেটাকে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিচারক। বুধবার বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ এই অঙ্ক ধার্য করেন; এর আগে এক জুরি রায়ে কোম্পানিটিকে দায়ী পাওয়া গিয়েছিল। অঙ্গরাজ্য নিউ মেক্সিকোর করা মামলায় এই রায় এলো।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস এই অঙ্ককে বর্ণনা করেছেন “আমেরিকার ইতিহাসে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় — না হলেও অন্যতম বড় — অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রায়” হিসেবে। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এই রায় সিলিকন ভ্যালির জন্য একটি সংকেত, একটি দ্ব্যর্থহীন বার্তা হওয়া উচিত।” তোরেস বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করতে এই রায় কাজ করবে এবং নিউ মেক্সিকো তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে থাকবে।
নিউ মেক্সিকোর সংবিধান অনুযায়ী, ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের জরিমানার অর্থ যায় অঙ্গরাজ্যের শিক্ষা খাতে। তোরেস বলেন, “আমরা হয়তো আগামী ১০০ বছরের স্কুল নির্মাণের খরচের ব্যবস্থা করে ফেলেছি।” তবে তিনি স্বীকার করেন, মেটা আপিল করলে — যা প্রত্যাশিত — সেই অর্থ আপাতত আটকে থাকবে। রায়ের অর্থের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও মেটার প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিক সাড়া দেননি। ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কভিত্তিক কোম্পানিটি বুধবার বিকেলে ত্রৈমাসিক আয় ঘোষণার কথা ছিল, আর জরিমানার ঘোষণার পর এর শেয়ারদর ২ শতাংশ বেড়ে লেনদেন হচ্ছিল।
গত সেপ্টেম্বরে জুরি রায় দিয়েছিল, রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা যখন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল, তখন মেটা নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইনের ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি লঙ্ঘন করেছে। মেটা আগেই বলেছে, সেপ্টেম্বরের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
মামলার কেন্দ্রে ছিল তৃতীয় পক্ষের একটি ব্যক্তিত্ব যাচাইয়ের কুইজ থেকে শুরু হওয়া তথ্য ফাঁসের ঘটনা। ওই কুইজের মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ প্রোফাইলের তথ্য সংগ্রহ করে তা বিক্রি করা হয় রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার কাছে, যাতে ২০১৬ সালের নির্বাচনের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন বানানো যায়। এখন বিলুপ্ত ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৬ সালের প্রচারশিবিরও।
বাকি পথটা নিউ মেক্সিকো একাই হেঁটেছে। আরও ৪৮টি অঙ্গরাজ্য আগস্টে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের একটি দেশব্যাপী সমঝোতায় সই করে ফেসবুকের সঙ্গে মামলা মিটিয়ে নেয়; ফ্লোরিডা ছাড়া নিউ মেক্সিকোই একমাত্র অঙ্গরাজ্য যারা সমঝোতায় না গিয়ে বিচার চেয়েছে। ওই সমঝোতায় ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা গোপনীয়তা লঙ্ঘনসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ দায় থেকে মেটাকে মুক্তি দেওয়ার শর্তও ছিল।
অঙ্ক নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ছিল আকাশ-পাতাল দূরে। নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি ডলার চেয়েছিলেন; তাদের যুক্তি ছিল, কোম্পানির শেয়ারদরে প্রভাব ফেলে এমন অঙ্ক হলেই কেবল মেটা আচরণ বদলাবে। বিপরীতে মেটার আইনজীবীরা বলেছিলেন, জরিমানা ৩৪০ কোটি ডলারের বেশি হওয়া উচিত নয়; তার ১০ গুণ বা আরও বেশি হলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হবে, অসাংবিধানিক হবে এবং আপিলে টিকবে না।
শুনানিতে মেটার আইনজীবী ম্যাট নিকলসন বলেন, ৪ হাজার কোটি ডলারের মতো অঙ্ক হবে “বিবেককে ধাক্কা দেওয়ার মতো”। অন্যদিকে নিউ মেক্সিকোর আইনজীবী র্যান্ডি ম্যাকগিন আহ্বান জানান, “নিজেদের বুলেটপ্রুফ ভাবা এবং যা খুশি তাই করতে পারা প্রযুক্তি জায়ান্টদের” বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। ১ অক্টোবরের শুনানিতে নিকলসন আরও বলেন, “জুরি এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেননি যে কোনো নিউ মেক্সিকোবাসী এসব বক্তব্য শুনেছেন বা দেখেছেন, কিংবা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
বিচার চলাকালে জুরিকে যাচাই করতে হয়েছে, গোপনীয়তা ও কনটেন্ট মডারেশন নিয়ে ফেসবুক ৩৪টি পৃথক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে কি না। অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলিদের যুক্তি ছিল, ফেসবুকের বক্তব্য শুধু সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের নয়, নিউ মেক্সিকোর পুরো জনগোষ্ঠীকেই বিভ্রান্ত করেছে। শেষ পর্যন্ত জুরি সেই যুক্তি মেনে নেয় — নির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগে ২১ লাখ লঙ্ঘনসহ মোট লঙ্ঘনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি।
নিউ মেক্সিকোর কৌঁসুলিরা আরও অভিযোগ করেছিলেন, ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ও সহিংস কনটেন্ট ছড়াতে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা পক্ষ তা জোরালোভাবে অস্বীকার করে বলেছে, কোম্পানির কনটেন্ট মডারেশন নীতি শক্তিশালী এবং বাকস্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ তার ভিডিও সাক্ষ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে কোম্পানির লাভের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাকস্বাধীনতা ও মডারেশনের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য রাখতে হয় তাদের। প্রতিরক্ষার একটি জয়ও এসেছে — জুরি মনে করেনি যে কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ে ভুয়া তথ্যসহ ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানো নিয়ে ফেসবুক মিথ্যা দাবি করেছে, এমনটা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছে।
মেটার আইনজীবীরা পরবর্তী আদালত নথিতে বলেছেন, যারা সে সময় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারই করছিলেন না, তাদের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন প্রযোজ্য নয়। আপিলে লঙ্ঘনের সংখ্যা কমে গেলে মোট জরিমানাও কমতে পারে; আপিল চলাকালে জরিমানার ওপর সুদ জমতে থাকবে। কোম্পানির আইনজীবীদের মতে, কতজন মানুষ বিভ্রান্তিকর বক্তব্য শুনে বা দেখে থাকতে পারেন, সেই হিসাবের ভিত্তিতে লঙ্ঘন গোনা নজিরবিহীন, আর এসব বক্তব্যে কারও ক্ষতি হয়েছে — এমন প্রমাণও নেই।
ফেসবুকের আইনজীবীরা সমাপনী যুক্তিতে বলেন, অঙ্গরাজ্যের প্রমাণ পুরোনো; পাঁচ বছর সময় পেয়েও নিউ মেক্সিকো তথ্য ফাঁসের আর মাত্র একটি ঘটনা খুঁজে পেয়েছে। তারা আরও বলেন, ২০২১ সালে মামলা দায়েরের পর থেকে কোম্পানি নীতি বদলেছে এবং মানদণ্ড লঙ্ঘনকারী কনটেন্টের ৯৯ শতাংশ তারা সরিয়ে দেয়। তোরেস সাংবাদিকদের বলেছেন, পাওয়া সব অর্থ অঙ্গরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার তহবিলে যাবে; একই ধরনের চর্চা বন্ধে নিষেধাজ্ঞাও চাইছে অঙ্গরাজ্য। পরের লড়াই এখন আপিল আদালতে — সেখানেই ঠিক হবে, এই রেকর্ড জরিমানা কতটা টিকে থাকে।






