এআইয়ের যুগে লেখকের অস্তিত্বের সংকট: অরুন্ধতী রায়ের উদ্বেগ ও কপিরাইটের লড়াই
এখন মাত্র কয়েক মিনিটেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া যায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফিচার, গল্প কিংবা প্রবন্ধ। নির্দেশনায় বলা যায়, লেখাটি হোক আব্বাস কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্রের মতো ধীর, গভীর ও জীবনঘনিষ্ঠ; কিংবা হোক নোবেলজয়ী কোনো পরিচিত লেখকের সাহিত্যিক আবহে। এআই মুহূর্তেই সেই নির্দেশনা অনুযায়ী শব্দ সাজিয়ে হাজির করতে পারে একটি লেখা।
প্রযুক্তি সৃজনশীলতাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই সহজলভ্যতা সব সময় সুফল বয়ে আনছে না—বিশেষ করে লেখকদের জন্য। লেখকের নিজস্ব ভাষা, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও স্বকীয়তার জায়গাটি যদি যন্ত্রের অনুকরণে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তবে সাহিত্য হারাতে পারে তার মৌলিক স্বর। তখন প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে সৃজনশীলতার সহায়ক নয়, বরং লেখকের অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যের জন্য নীরব ট্র্যাজেডি।
ঘটনাটি ২০১৬ সালের। জাপানের শিনইচি হোশি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য তখন পাণ্ডুলিপি যাচাই-বাছাই চলছিল। প্রতিযোগিতায় জমা পড়েছিল মোট ১ হাজার ৪৫০টি পাণ্ডুলিপি; প্রাথমিক পর্বে মনোনীত হয় ১১টি। সেগুলোর একটি ছিল 'দ্য ডে আ কম্পিউটার রাইটস আ নভেল'।
আসল চমক ছিল অন্য জায়গায়। বিজয়ীর নাম ঘোষণার মাত্র কিছুক্ষণ আগে বিচারকেরা জানতে পারেন, উপন্যাসটি কোনো মানুষের লেখা নয়—এটি লিখেছে 'সেকাই ক্যামেরা' নামের একটি এআই প্রোগ্রাম। ঘটনাটি তখন সাহিত্যজগতে বেশ আলোড়ন তোলে। শেষ পর্যন্ত এআইয়ের লেখা উপন্যাসটি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর থেকে লেখালেখিতে এআই ব্যবহারের বিষয়টি তুমুল আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে শোনা গেছে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্যও নাকি এআই দিয়ে লেখা কোনো রচনা মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল—যদিও ঘটনাটি কতটা সত্য, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে লেখকের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখার লড়াই। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, জীবনবোধ, পর্যবেক্ষণ ও চর্চার মধ্য দিয়ে একজন লেখক নিজস্ব ভাষাভঙ্গি নির্মাণ করেন। কিন্তু এআই যখন সেই ভাষা, শব্দচয়ন ও বর্ণনাশৈলী অনুকরণ করতে পারে, তখন মৌলিকত্বের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। লেখকের নিজের লেখাকেও যদি এআইয়ের অনুকরণ বলে সন্দেহ করা হয়, তবে তাকে নিজের সৃষ্টির সত্যতা প্রমাণের দায় নিতে হবে।
এই সংকটের কথাই খোলাখুলি বলেছেন খ্যাতনামা লেখক অরুন্ধতী রায়। এআই প্রসঙ্গে তার ভাষ্য—আমার ভয় হয়, খুব শিগগিরই যখন আমি আমার মতো করে লিখব, যে ভাষাকে একান্ত নিজের করে তুলতে কয়েক দশক ধরে খেটেছি, সেই ভাষায় লিখব, তখন আমাকে বলা হবে, এ তো আপনার লেখা বলে মনে হচ্ছে না, এ তো আসলে এআই।
অরুন্ধতী রায়ের এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে লেখকের সৃজনশীল শ্রম ও মেধাস্বত্বের প্রশ্ন। বছরের পর বছর ধরে অভিজ্ঞতা, চিন্তা, আবেগ ও পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে একজন লেখক একটি স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি তৈরি করেন; তার শব্দচয়ন, বাক্য নির্মাণ, বর্ণনার ধরন ও লেখার টোন হয়ে ওঠে তার নিজস্ব পরিচয়ের অংশ।
কিন্তু সেই লেখাই যখন লেখকের অনুমতি ছাড়াই বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—একজন লেখকের সৃজনশীল সম্পদের ওপর অধিকার কার? তার ভাষা ও লেখার ধরন অনুকরণ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলে, সেই অনুকরণের নৈতিক ও আইনি দায় কে নেবে?
অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে লেখকদের কপিরাইট-সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গ তুলে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন অরুন্ধতী রায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়াই যেসব লেখকের বই এলএলএম প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে, তিনি তাদের একজন। এ-সংক্রান্ত একটি সম্মিলিত মামলার পর তাকেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
রায়ের বর্ণনায়, বইপ্রতি প্রায় দুই হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাবের মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তার অভিযোগ, বইগুলো তৈরি করতে যে দীর্ঘ সময়, শ্রম ও জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যয় হয়েছে, সেই মূল্যকে এভাবে অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নোটিশে বলা হয়েছিল, পাইরেটেড পিডিএফ সংরক্ষিত থাকে এমন দুটি ওয়েবসাইট থেকে বইগুলো ডাউনলোড করা হয়েছিল; তবে অ্যানথ্রপিক কোনো অন্যায় করেছে বলে স্বীকার করেনি—এ কথাও নোটিশে ছিল।
পুরো অভিজ্ঞতাটিকে বোঝাতে গিয়ে রায় যে উপমা ব্যবহার করেছেন, তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তার ভাষায়, মনে হয়েছে যেন তার অজান্তেই শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে। কারণ, যে যন্ত্রটি তার লেখা দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছে, সেটি তৈরির প্রক্রিয়ায় তার সৃজনশীল শ্রম ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
এই সংকট শুধু বিশ্বখ্যাত লেখকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ৩২ বছর বয়সী কপিরাইটার সারাহ সুজুকি হার্ভার্ড পেশাগতভাবে খুব বেশি আবেগপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত নন। কিন্তু এআইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে নিজের লেখাকে মানুষের লেখা হিসেবে চেনানোর জন্য তিনি বদলে ফেলছেন নিজের পরিচিত লেখার ধরন—ইচ্ছাকৃতভাবে পোস্ট ও প্রবন্ধে চলিত ভাষা ব্যবহার করছেন, কখনো যোগ করছেন 'আরে ভাই, সত্যি বলতে'—এর মতো কথ্য অভিব্যক্তি।
সব মিলিয়ে, লেখালেখিতে এআইয়ের ব্যবহারকে এককথায় ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলে চিহ্নিত করা কঠিন। গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, সম্পাদনা কিংবা নতুন ভাবনার সূত্র খুঁজতে এআই কার্যকর সহায়ক হতে পারে। কিন্তু লেখকের অনুমতি ছাড়া তার সৃষ্টিকর্ম প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা এবং সেই সৃজনশীলতার অনুকরণে নতুন লেখা তৈরি করা নৈতিকতার প্রশ্ন সামনে আনে। প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করাই হয়তো সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন স্বচ্ছতা, কপিরাইটের সুরক্ষা এবং লেখকের সম্মতির নিশ্চয়তা। কারণ, সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভব, দায়বদ্ধতা ও জীবনদর্শন।




