ডেঙ্গুতে এক দিনে আরও ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩৭৩ জন
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার কোনো লক্ষণ নেই। সর্বশেষ এক দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৭ জন মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৩ জন রোগী। মৃত্যু ও ভর্তির এই যুগ্ম সংখ্যাই বলছে, মৌসুমের এই পর্যায়ে এসেও এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখনো জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হয়ে আছে।
এক দিনে ৭ জনের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয় — প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যাদের কাছে এই পরিসংখ্যান অপূরণীয় ক্ষতি। আগের দিনগুলোতেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর নিয়মিত এসেছে; ফলে নতুন এই মৃত্যুগুলো মিলিয়ে সামগ্রিক চিত্রটি ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে।
হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৩ — এক দিনে এত রোগী ভর্তি হওয়ার অর্থ, জ্বরে আক্রান্ত মানুষের চাপ হাসপাতালগুলোতে অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শয্যা, স্যালাইন ও রক্তের উপাদানের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; ভর্তির সংখ্যা বেশি থাকলে সেই ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও বাড়ে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ সাধারণ জ্বরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেকেই শুরুতে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু জ্বর, শরীরে ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করানোই নিরাপদ পথ — এই সাধারণ সতর্কতার কথা এই সময়ে আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিনের পরিসংখ্যান।
বিশেষ করে শরীরে রক্তক্ষরণের লক্ষণ, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে। এমন লক্ষণে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ সব সময়ই দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা — কারণ ডেঙ্গুর জটিল রূপে সময়মতো চিকিৎসাই জীবন বাঁচাতে পারে।
রোগ প্রতিরোধের লড়াইও চলছে মাঠপর্যায়ে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভোলার মনপুরায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। এডিস মশা জমে থাকা পানিতে বংশবৃদ্ধি করে, তাই বাড়ির আশপাশের জমা পানি ও আবর্জনা পরিষ্কার রাখাই প্রতিরোধের প্রথম শর্ত — স্থানীয় পর্যায়ের এমন অভিযান সেই সচেতনতারই অংশ।
মনপুরার এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, ডেঙ্গু মোকাবিলা কেবল হাসপাতালের কাজ নয়। পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্রসহ যেখানে পানি জমতে পারে সেসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করা — এই ছোট ছোট কাজ মিলেই মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা সম্ভব।
উৎসবের এই সময়ে মানুষের চলাচল ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত বেশি থাকে। ভ্রমণে ও আতিথেয়তায় থাকা অবস্থায়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষা ও জ্বর হলে অবহেলা না করার বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ — কারণ ডেঙ্গু কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়।
শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরিবারের এই সদস্যদের জ্বর হলে বাড়তি সতর্কতা ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার। ঘুমের সময় মশারি ব্যবহার ও দিনের বেলাতেও মশা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা এই সময়ে জরুরি অভ্যাস।
এক দিনে ১ হাজার ৩৭৩ জন ভর্তির অর্থ হলো, রোগটি এখনো বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে আছে। সংখ্যাটি আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যায়, তার ওপরই বোঝা যাবে প্রকোপ কমতে শুরু করেছে কি না। তত দিন প্রতিদিনের এই হিসাবই সতর্ক থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।
সব মিলিয়ে আজকের বার্তা স্পষ্ট: ডেঙ্গু এখনো প্রাণ কাড়ছে, হাসপাতালে ভর্তির চাপ কমেনি। চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধের দায়িত্ব প্রতিটি পরিবারের — নিজের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা আর জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়া, এই দুই কাজই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
আগামী দিনের হিসাবে মৃত্যু ও ভর্তির সংখ্যা কমে আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে সবার। তবে সংখ্যা কমলেও সতর্কতা শিথিল করার সুযোগ নেই — মশার মৌসুম পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধের অভ্যাস ধরে রাখাই নিরাপদ পথ।




