যুদ্ধের প্রতিটি বছরে ইউরোপে বাড়ছে রুশ বসতি, বৈধ বাসিন্দা এখন ৮ লাখ ৭৬ হাজার
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বৈধভাবে বসবাসকারী রুশ নাগরিকের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শেষে এই সংখ্যা পৌঁছেছে ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৬০০ জনে।
২০২২ সালের শুরুর দিকে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে সংখ্যাটি বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার। ২০২১ সালে ইইউ সদস্য দেশগুলোতে বৈধ অস্থায়ী বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি ছিল ৭ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ রুশ নাগরিকের—সেখান থেকে বৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় রুশ সম্প্রদায়ের বাস জার্মানিতে, সেখানে বাসিন্দার সংখ্যা ২ লাখ ১৮ হাজার। এরপর রয়েছে স্পেনে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০০ এবং এস্তোনিয়ায় ৭৮ হাজার ৪০০ জন।
দক্ষিণ ইউরোপে বৃদ্ধি সবচেয়ে তীব্র হয়েছে। এই সময়ে স্পেন ৪৪ হাজার ৪০০ রুশ নাগরিককে বসবাসের অনুমতি দিয়েছে, ফ্রান্স দিয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ জনকে। সাইপ্রাস ও পর্তুগালে রুশ বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে আড়াই গুণ ও সাড়ে তিন গুণ।
তবে সব দেশে চিত্র এক নয়। লাতভিয়া, এস্তোনিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রে রুশ বাসিন্দার সংখ্যায় সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে—কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বাল্টিক দেশগুলোতে বড় রুশভাষী সম্প্রদায় নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগই এর পেছনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইইউর বাইরেও বড় রুশ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। সার্বিয়ায় রুশ জনসংখ্যা আগ্রাসনের আগে প্রায় ৫ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯০০ জনে। চলতি বছরের বসন্ত নাগাদ কাজাখস্তান নিয়েছে ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি রুশ অভিবাসী, আর্মেনিয়ায় রয়েছেন ৪৩ হাজার ৫০০ এবং জর্জিয়ায় ৭০ হাজার জন।
তুরস্ক যুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম দিকে বিপুল সংখ্যক রুশকে টেনেছিল, কিন্তু পরে বসবাসের নিয়ম কঠোর করে। জুন নাগাদ সেখানে বৈধ রুশ অনুমতির সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৫ হাজার ৯০০-তে, যা ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ সংখ্যার অর্ধেক।
দেশত্যাগের ধারা অনুসরণকারী গবেষকেরা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে অন্তত চারটি আলাদা ঢেউ চিহ্নিত করেছেন। চলতি বসন্ত থেকে শুরু হওয়া সবশেষ ঢেউয়ের পেছনে রয়েছে মস্কোর সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য নতুন করে সৈন্য সংগ্রহের আশঙ্কা।
রুশদের বিদেশে আইনি সহায়তা প্রকল্প কোভচেগের প্রতিষ্ঠাতা আইনজীবী আনাস্তাসিয়া বুরাকোভা বলেছেন, ‘এখন সবাই বুঝে গেছে রাশিয়ায় তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভবিষ্যতের কোনো ছবি নেই, ছয় মাস বা এক বছর পর কী হবে তার কোনো ধারণা নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, সৈন্য সংগ্রহ ও বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ঝুঁকি মানুষ খুব ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করে।
স্বতন্ত্র গবেষকদের জরিপে দেখা গেছে, দেশছাড়া রুশদের বড় অংশই তরুণ দম্পতি, প্রায়ই সন্তানহীন এবং দুজনেরই বয়স ৩৬ বছরের নিচে। তাদের শিক্ষার মাত্রা উচ্চ এবং তারা কেন্দ্রীভূত এমন পেশায়, যেগুলো হয় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ঝুঁকিতে—সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক—নয়তো আন্তর্জাতিক চাহিদা বেশি—বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও শিক্ষাঙ্গন। যারা গেছেন তাদের প্রায় ২০ শতাংশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই, আর প্রায় ১৮ শতাংশ বিদেশে পড়ছেন বা পড়ার পরিকল্পনা করছেন।
আয়োজক দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হলেও অসম। আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ায় মানুষ ও পুঁজির হঠাৎ আগমন ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ৯ থেকে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রেখেছিল বলে কেস সেন্টার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। বেশিরভাগ রুশ অভিবাসী স্থানীয় চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা না করে দূর থেকে কাজ করেছেন বা নিজের ব্যবসা গড়েছেন।
কেউ কেউ ফিরেও গেছেন, তবে তার মাত্রা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। স্বতন্ত্র আউটরাশ সমাজতাত্ত্বিক প্রকল্পের হিসাবে ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত দেশত্যাগীদের ৮ শতাংশের বেশি ফেরেননি। রাশিয়ার নিজস্ব সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচি ২০২৫ সালে রেকর্ড সর্বনিম্ন মাত্রা ছুঁয়েছে—মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ জনকে দেশে এনেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ইউরোপজুড়ে রুশ বসতির এই বাড়তি ধারাও ততই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।



