লিখিত রূপ গড়ে মাতৃভাষা বাঁচানোর লড়াইয়ে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো
পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মানুষ নিজ নিজ মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে কাজ করে যাচ্ছেন ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিকভাবে। নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বললেও লিখিত রূপ না থাকায় মাতৃভাষায় লেখাপড়া কিংবা সাহিত্য রচনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে কয়েক বছর ধরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
চাকমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর কিছু সংগঠন এবং ব্যক্তি তাঁদের মাতৃভাষার লিখিত রূপ প্রণয়নে নিয়োজিত রয়েছেন। তেমনই একটি সংগঠন চাকমা কালচারাল কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (সিসিসিবি)।
২০২৩ সাল থেকে সংগঠনটির নেতারা পাহাড়ের দুর্গম গ্রামে তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীদের চাকমা বর্ণমালার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে সরাসরি প্রশিক্ষণ ও অনলাইনের মাধ্যমে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীকে এ ভাষায় শিক্ষা দিয়েছে সিসিসিবি। মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করে ভাষার সৌন্দর্য ও শক্তি বাড়াতেও তৎপর তাঁরা।
সংগঠনটির উপদেষ্টা আনন্দ জ্যোতি চাকমা বলেছেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ভাষা চর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ভাষা রক্ষা করা এবং সবার মাঝে এটি ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা সাংগঠনিকভাবে কাজ শুরু করি। আমাদের সংগঠনের ছেলেমেয়েরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ভাষা শিক্ষা দিচ্ছে, বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এতে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও আস্তে আস্তে চাকমা ভাষাটি রপ্ত করতে পারছে, লিখতে পারছে।’ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি।
সংগঠনের পাশাপাশি বিদ্যালয়েও এখন প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় বই বিতরণ ও শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় বই পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বর্ণমালা ও বিভিন্ন শব্দ লিখতে পারছে। তবে শিক্ষকদের এ ক্ষেত্রে আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষক-অভিভাবকরা।
বনরূপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মুকুল চাকমা বলেন, ‘আগে আমি বলতে পারলেও লিখতে পারতাম না। স্কুলে বই দেওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে এখন চাকমা মাতৃভাষায় লিখতে পারি।’
অভিভাবক ঝর্না চাকমা বলেন, বই বিতরণের পর বাচ্চারা চাকমা বর্ণমালা শিখতে ও লিখতে পারছে। তবে তাঁর দাবি, এটি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়ানো উচিত এবং মানসম্মত শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালনা করা না গেলে এই কার্যক্রমের সার্থকতা আসবে না; এ জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক জেমি চাকমা বলেন, ‘জানুয়ারির ১ তারিখে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় বই বিতরণ করা হয়েছে। তাঁরা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আরও বেশি দক্ষ করার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’
শুধু চাকমা নয়; তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা ভাষা টিকিয়ে রাখতে তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা ও ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশন আলাদাভাবে কাজ করছে। দুই বছর আগে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ত্রিপুরা ভাষায় ককবরক শব্দভান্ডারসহ চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমা ভাষার অভিধান প্রকাশিত হয়েছে। শব্দ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হতে যাওয়া ভাষাগুলোর চর্চার সুযোগ বেড়েছে।
তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার সাবেক মহাসচিব অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘শুরুতে ইউএনডিপির সহযোগিতায় আমরা তঞ্চঙ্গ্যা বর্ণমালার সফটওয়্যার করেছি। এরপর জেলা পরিষদের সহযোগিতায় প্রাথমিক শিক্ষার বই বের করেছি, যেখানে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ রয়েছে। দুই বছর আগে তঞ্চঙ্গ্যা অভিধানও প্রকাশ করেছি। ভাষাটি যেন হারিয়ে না যায় এবং এই ভাষায় যাতে সাহিত্য রচনা সম্ভব হয়, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।’
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ত্রিপুরা ভাষা গবেষক খোকনেশ্বর ত্রিপুরা জানান, তিন পার্বত্য জেলায় ত্রিপুরাদের বিভিন্ন গোত্র বাস করে এবং গোত্রভেদে ককবরক ভাষার শব্দ আলাদা হয়ে থাকে। কোন গোত্র কোন শব্দ কীভাবে বলে, তা এক জায়গায় এনে প্রকাশের চেষ্টা তাঁরা করেছেন এবং এই চেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
ইতিমধ্যে রাঙামাটিতে ত্রিপুরা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে সাড়া ফেলেছেন মুকুল কান্তি ত্রিপুরা। ২০২১ সালে তাঁর ত্রিপুরা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এমাংনি খুমতাং’—বাংলায় ‘স্বপ্নের পুষ্পমাল্য’—এর মোড়ক উন্মোচন হয়। তিনি জানান, সাধক খুশীকৃষ্ণ ত্রিপুরা ওরফে বলংরায় সাধুর ১৯৪২ সালে রচিত বইটি এই ভাষার সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন; মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও ব্রাদার মন্ত্রজয় হরফ তৈরি করলেও সেগুলো সামাজিক স্বীকৃতি পায়নি, ফলে ভাষা রক্ষা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। পরে ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ককবরক চর্চায় রোমান হরফ ব্যবহার শুরু হয়।
ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষা স্বতন্ত্র ও স্বকীয়তায় বেঁচে থাকুক—এমনই প্রত্যাশা ভাষাপ্রেমী ও সচেতন মানুষদের। তবে সংগঠনগুলোর নেতাদের ভাষ্য, এই লড়াই টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাই এখন সবচেয়ে জরুরি।



