৯০ বছরেও ভিক্ষার ঝুলি হাতে শায়েস্তাগঞ্জের প্ল্যাটফর্মে সাফিয়া বেগম: ‘অভাব তো বয়স বোঝে না’
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের প্ল্যাটফর্মে কখনো, কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে হাতে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ান ৯০ বছর বয়সী সাফিয়া বেগম। চোখে বয়সের ছাপ, মুখে ক্লান্তির রেখা আর পরনে জীর্ণ কাপড় — জীবনের শেষ বয়সে তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব আর অসহায়ত্ব।
শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। হাঁটতে কষ্ট হয়, শক্তি কমে গেছে, তবু থেমে নেই তাঁর পথচলা। কারণ থেমে গেলে হয়তো জুটবে না একবেলার খাবার। এই বাস্তবতাই প্রতিদিন তাঁকে ঘর থেকে বের হতে বাধ্য করে।
সাফিয়া বেগমের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ধানি মহল্লায়। স্বামী নেই। একমাত্র ছেলে থাকলেও তিনি মায়ের কাছে নেই; ছেলেটি ভবঘুরে জীবনযাপন করেন, ফলে মায়ের খোঁজ নেওয়া বা নিয়মিত দেখাশোনা করার মতো অবস্থায় তিনি নেই।
এখন মেয়ের কাছেই থাকেন সাফিয়া বেগম। কিন্তু মেয়ের সংসারেও অভাব। নিজেদের সংসার চালাতেই যখন হিমশিম খেতে হয়, তখন বৃদ্ধা মায়ের খাবার ও প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতাই তাঁকে মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য করেছে।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে কথা হয় সাফিয়া বেগমের সঙ্গে। জীবনের গল্প বলার একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর কণ্ঠ বারবার ভারী হয়ে আসছিল, যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে বেরিয়ে আসছিল বছরের পর বছর জমে থাকা কষ্ট।
সাফিয়া বেগম বলেন, ছেলে থেকেও নেই। সে এক জায়গায় থাকে না, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। তাঁর দেখাশোনা করার কেউ নেই, তাই মেয়ের কাছে থাকেন। মেয়ের সংসারেও অনেক অভাব, তারা নিজেরাই ঠিকমতো চলতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। তাই শরীর না চললেও ভিক্ষা করতে বের হই।’
তিনি জানান, অনেক সময় বিভিন্ন মাজারে চলে যান। নামাজ পড়েন, তজবি পড়েন। কেউ দয়া করে কিছু টাকা দিলে তা দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। তবু জীবন থেমে থাকে না।
বৃদ্ধার পরনের কাপড়টির দিকেও চোখ আটকে যায়। পুরোনো ও ছেঁড়া কাপড়টি যেন তাঁর অসহায় জীবনেরই নীরব সাক্ষী। সাফিয়া বেগম বলেন, ‘গায়ের কাপড় ছিঁড়ে গেছে। টাকা নেই, নতুন কাপড় কিনতে পারি না। কেউ একটা নতুন কাপড়ও দেয় না।’
তাঁর চাওয়ার তালিকা খুব ছোট। তিনি বলেন, ‘আমার আর কী চাওয়া আছে? একটা কাপড় আর দুবেলা খাবার হলেই হয়। বয়স হয়ে গেছে। শরীর চলে না। কিন্তু, অভাব তো বয়স বোঝে না, পেট তো খাবার চায়।’
৯০ বছরের এই বৃদ্ধা জানান, সরকারি ভাতার একটি কার্ড পাওয়ার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্নজনের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তাঁর আকুতি, ‘একটা সরকারি ভাতার কার্ড যদি পাইতাম, তাহলে অনেক উপকার হতো। অন্তত প্রতিমাসে কিছু টাকা পেতাম। মানুষের কাছে এভাবে হাত পাততে হতো না।’
সাফিয়া বেগমের জীবন শুধু একজন বৃদ্ধার দুঃখের গল্প নয়; এটি এমন এক বাস্তবতার চিত্র, যেখানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষও অভাবের কাছে পরাজিত হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন। যে বয়সে একজন বৃদ্ধার পাশে থাকার কথা সন্তানের, যে বয়সে তাঁর হাতে থাকার কথা ওষুধ কিংবা তসবিহ, সেই বয়সে তাঁর হাতে উঠেছে ভিক্ষার ঝুলি।
শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের কোলাহলের মাঝে সাফিয়া বেগমের অসহায় বসে থাকা হয়তো অনেকের চোখে সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় ৯০ বছরের একটি জীবন, হারিয়ে যাওয়া স্বামী, দূরে সরে যাওয়া সন্তান এবং অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই।
সাফিয়া বেগমের এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই। নেই বাড়ি-গাড়ির চাওয়া, নেই জমিজমার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর চাওয়া খুব সামান্য — একটু নিরাপদ জীবন, পরনের একটি ভালো কাপড়, দুবেলা খাবার এবং সরকারি একটি ভাতার কার্ড। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মানবিক মানুষেরা পাশে দাঁড়ালে হয়তো জীবনের শেষ দিনগুলোতে আর ভিক্ষার ঝুলি হাতে রাস্তায় ঘুরতে হবে না তাঁকে।


