মরক্কোতে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর সরকার, ধারাবাহিকতার মাঝেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে আল মানসুরি
মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ১৬ অক্টোবর নতুন সরকার নিয়োগ দিয়েছেন, যার প্রধান হয়েছেন ফাতিমা জোহরা আল মানসুরি। মরক্কোর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেলেন — এই নজির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
আল মানসুরির দল অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (পিএএম) সেপ্টেম্বরের সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছে। দলটি আরও তিনটি দলের সঙ্গে জোট বেঁধে নতুন সরকার গঠন করেছে এবং মন্ত্রিসভায় পিএএমের প্রাধান্যই চোখে পড়ার মতো।
তবে নতুন মন্ত্রিসভা পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে। আগের সরকারের অর্ধেকের বেশি সদস্য নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি তথাকথিত সার্বভৌম মন্ত্রণালয়গুলো সরাসরি রাজার সংরক্ষিত ক্ষমতার আওতায় থাকে।
এমন প্রেক্ষাপটে অনেক মরক্কোবাসীই প্রশ্ন তুলছেন, একই মানুষদের আবার সরকারে ফিরিয়ে আনা হলে নির্বাচন আয়োজনের অর্থ কী ছিল। নতুন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তাই শুরুতেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
পিএএমের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও উপদেষ্টা আলি হিম্মা, মূলত মরক্কোতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান এবং বিশেষ করে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (পিজেডি) প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে।
২০১৬ সালের নির্বাচনে পিজেডিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে দলটি নিজেকে বৈধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ২০২১ সালে জোট সঙ্গী হিসেবে সরকারে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাদের ঝুলিতে ছিল। এবার অবশেষে তারা সরকার গঠনের নেতৃত্বে উঠে এসেছে।
তবে এই জয়কে প্রেক্ষাপটে রাখা জরুরি। নির্বাচনে যোগ্য ভোটারদের ৬২ শতাংশই ভোট দিতে যাননি; ভোটের দিন কর্তৃপক্ষকে মানুষকে ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানাতে হয়েছিল। অনিয়মের সন্দেহও উঠেছে, যদিও কয়েকটি ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ফলের নথি প্রকাশ না হওয়ায় পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক দলগুলো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি।
নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফাওজি লাকজায়ের পিএএমে যোগ দেওয়ার মতো ঘটনাও আলোচনায় এসেছে; মরক্কোর ফুটবলের সাফল্য থেকে পাওয়া জনপ্রিয়তাই তাঁর সম্পদ।
নতুন সরকারের কর্মসূচি উচ্চাভিলাষী। রাজার সভাপতিত্বে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ২০২৭ সালের অর্থ বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সামাজিক ইস্যু, নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা এবং যুবসমাজের অন্তর্ভুক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশ সরকারের অনুকূলে নয়। জ্বালানির দাম বাড়ছে, আর ফসফেট উৎপাদনের মতো মরক্কোর প্রধান খাতগুলোর কাঁচামালের খরচও বেড়ে চলেছে। ফসফেট আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ওসিপি গ্রুপ — দেশটির সম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস — এখন কঠিন সময় পার করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর আশঙ্কা, যা শুষ্ক আবহাওয়া ডেকে এনে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলতে পারে — এমন এক দেশে, যেটি টানা সাত বছর খরার মধ্য দিয়ে গেছে। পর্যটন খাতও বৈশ্বিক ভ্রমণ মন্দা, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের উত্তেজনা থেকে তৈরি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে অভিজ্ঞ ও সোচ্চার বিরোধী দলকেও — একদিকে ইসলামপন্থী পিজেডি, অন্যদিকে কট্টর বামপন্থীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে চ্যালেঞ্জ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে জনরোষ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রয়েছে নির্বাচনী কারসাজির অভিযোগ, আর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী পড়েছেন মরক্কোকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বলা ও সেউতা প্রসঙ্গে মন্তব্যের জেরে তৈরি বিতর্কে, যা স্পেনের কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে নেয়নি।
সব মিলিয়ে জনমত এখন পর্যন্ত সংশয়াচ্ছন্ন। উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি থাকলেও এই সরকারের মেয়াদ গড়ে দেবে ঘরে-বাইরের এমন সব কঠিন পরিস্থিতি, যার বেশির ভাগই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।




