নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১৪ জনের মৃত্যু: তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি, ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছিল বাসটির
নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত আরপি পরিবহনের বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
নাটোর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ চলতি বছরের ১৩ মে শেষ হয়েছে। তবে বাসটির রুট পারমিটের মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে চলাচল করছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার ভোররাতে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়ায়, জাহেদা ক্লিনিকের সামনে ও সরকারপাড়া এলাকায়। কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও চারজনের মৃত্যু হয়, ফলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ জনে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মহাসড়কে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটির সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। দুর্ঘটনায় বাস ও ট্রাক— দুটি যানবাহনের চালকই নিহত হয়েছেন। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), একই উপজেলার বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), জাজিরা উপজেলার সামাদ (৭০) ও কাশেম (৩৫)। এ ছাড়া বাসটির চালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থলে যান জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার শরীফুল হক। এ সময় জেলা প্রশাসক নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশ সুপার ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্ঘটনা রোধে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নাটোরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাহাবুবুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর সকালে আহত নয়জন হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে দুজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি সাতজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে; অন্য চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বাসের যাত্রী আব্দুস সালাম অভিযোগ করেছেন, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল এবং বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল। এই অভিযোগ এবং ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলের বিষয়টি এখন তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে কতটা উঠে আসে, সেদিকেই নজর থাকবে। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।



