সোমালিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা বাড়ছে, বেসামরিক পরিবারগুলোর দুর্ভোগের হিসাব মিলছে না
সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বেসামরিক মানুষের যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা সামনে এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বর্ণনায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান জোরদার হয়েছে, আর সেই অভিযানের ছাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
মারিয়াম হাজি আবদি গুলেদ এখনো প্রতিদিন ছেলেকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যান, আবার নিজেই ফিরিয়ে আনেন। প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ সোমালিয়ায় সন্দেহভাজন মার্কিন হামলায় তাঁর ছেলের শরীরে গোলার টুকরো ঢুকে যায়, যা এখনো কোমরের কাছে আটকে আছে।
ছেলেটির নাম আবদিকাদির সালাহ, বয়স ছিল সাত বছর যখন সে আহত হয়। ঘটনাটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে জুবাল্যান্ড রাজ্যের জামামে এলাকায় মার্কিন বিমান হামলা ও সোমালি স্থলবাহিনীর যৌথ অভিযানের সময়কার। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, টুকরোটি বের করতে গেলে ছেলেটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।
মারিয়াম বলেন, খেলার সময় অন্য কোনো শিশু ধাক্কা দিলে টুকরোটি নড়ে যেতে পারে—এই ভয়েই তিনি ছেলের ওপর নজর রাখেন। তাঁর ভাষায়, বিমান কখনো তাদের ছাড়ে না, রাতদিন ওপরে থাকে, আর তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
সেদিনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে পরিবারটিকে। সন্তানেরা স্কুল থেকে ফেরার পর মারিয়াম নাশতা তৈরি করছিলেন, তখন মাথার ওপর বিমানের গর্জন শোনা যায়। শিশুরা শব্দের দিকে বাইরে ছুটে যায়। তিনি তাদের ভেতরে আনতে যান, তখনই কাছেই একটি গোলা পড়ে, এরপর সামনের দরজার কাছে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে, চারপাশে আরও বোমাবর্ষণ হয়।
সেই হামলায় মারিয়ামের ছয় সন্তানের তিনজন আহত হয়, আবদিকাদিরের আঘাত ছিল সবচেয়ে গুরুতর। চিকিৎসার জন্য মোগাদিশু পৌঁছাতে তাঁর এক দিন ও এক রাতের বেশি, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। সেই যাত্রাপথে ছেলেটি রক্তাক্ত অবস্থায় যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়েছে।
সংখ্যার দিক থেকেও হামলা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ডের (আফ্রিকম) প্রকাশ্য নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোমালিয়ায় ৮৪টি হামলা হয়েছে। স্বাধীনভাবে এই অভিযান পর্যবেক্ষণকারী নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের হিসাবে একই সময়ে হামলার সংখ্যা ৮৮টি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে, ২০২৫ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ওই এলাকায় তারা বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তারা মানছে না। আফ্রিকম জানিয়েছে, জামামেতে মার্কিন অভিযানে ১০ থেকে ১২ জন বেসামরিক নিহত এবং ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের প্রতিবেদন তারা মূল্যায়ন করেছে।
আফ্রিকমের সিদ্ধান্ত হলো, পর্যালোচনা করা তথ্য তাদের ‘হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি’ মানদণ্ড পূরণ করেনি—অর্থাৎ মার্কিন হামলায় ওই ক্ষতি হয়েছে কি না, তা প্রমাণিত হয়নি তাদের মতে। তারা আরও বলেছে, নতুন তথ্য এলে মূল্যায়ন আবার খোলা হতে পারে। তবে তদন্তকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, হাসপাতালের কর্মী বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তর তারা দেয়নি।
স্বাধীন পর্যবেক্ষণে চিত্র ভিন্ন। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার নেতৃত্বাধীন একটি পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক ২০২৫ সালের ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর জামামের আশপাশে লড়াই ও বিমান হামলায় ১২ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত করেছে। একই সময়ে ২২ হাজার ৮০০ মানুষ জামামে ও আশপাশের গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে, যাকে তারা দ্রুত ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি বলে বর্ণনা করেছে। দোকান ও গুদামের ক্ষতি, চলাচলে বিধিনিষেধ ও পালিয়ে আসা মানুষের মানসিক দুর্দশার কথাও উঠে এসেছে।
কৃষক আলি আদেন বোরো, বয়স ৫২, সেই অভিযানে তাঁর পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বাড়ির বাইরে থাকার সময় ফোনে জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী আঘাত পেয়েছেন। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন বিমান হামলার ধ্বংসাবশেষ তাঁর ঘাড়ে লাগে। তিনি ও গর্ভের সন্তান দুজনেই মারা যান। বেঁচে যাওয়া তিন সন্তান এখন দাদির কাছে থাকে, আর আলি কাজের সন্ধানে গ্রাম ও কিসমায়োর মধ্যে ঘুরছেন, ঋণে জর্জরিত, বাইরের সহায়তা প্রায় পাননি বললেই চলে।
আরেক কৃষক নুর আলি নুরের স্ত্রী একই সময়ের লড়াইয়ে আহত হন। হামলার ধ্বংসাবশেষ তাঁর শরীরের নিচের অংশ ও ডান হাতে লাগে, তিনি কোমর থেকে নিচে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বুকের দুধ খাওয়া সবচেয়ে ছোট মেয়েটিও সামান্য আহত হয়। পাঁচ সন্তান নিয়ে নুর স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না, চিকিৎসার জন্য তাঁর এখনো ঋণ রয়েছে। এয়ারওয়ার্সের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্কাইভ প্রধান আনা জান বলেন, বিমান হামলার পরিণতি বছরের পর বছর থাকতে পারে, আর সোমালিয়ায় আহতদের সংখ্যা প্রায়ই কম করে দেখানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার মিলবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।






