ফ্রান্সজুড়ে দাঙ্গা-লুটপাট: ম্যাক্রোঁকে সতর্ক করলেন সাবেক তারকা ফুটবলার পেতি
ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংস বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটের ঘটনায় এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন দেশটির সাবেক ফুটবল তারকা এমানুয়েল পেতি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী এই সাবেক মিডফিল্ডার দাঙ্গাকারীদের ‘গুন্ডা’ আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে সৎ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্কুল নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সপ্তাহান্তে ভয়াবহ রূপ নেয়। মুখোশধারী জনতা দোকানের জানালা ভেঙে ফেলে, গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্যারিস ও মার্সেইয়ে দাঙ্গা পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে হয়, আর প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ নিজে স্বীকার করেছেন, তিনি ‘রাগ ও লজ্জা’ দুটোই অনুভব করছেন।
ফক্স নিউজ ডিজিটালের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ইতিমধ্যে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি দাঙ্গাকারীকে আটক করা হয়েছে। পোড়া গাড়ি, লুট হওয়া দোকান আর ভাঙা রাস্তা এখন ফ্রান্সের বড় শহরগুলোর পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
রোববার ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিও বার্তায় পেতি তার ‘গভীর ক্ষোভ’ প্রকাশ করেন। সপ্তাহজুড়ে চলা ছাত্র বিক্ষোভের পর ১৭ অক্টোবর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশব্যাপী বড় সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল; পুলিশের এক সূত্রের হিসাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের অংশ নেওয়ার আশঙ্কা ছিল, যার মধ্যে প্যারিসেই ৪০ হাজার।
সহিংসতার মাত্রা বোঝা যায় মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঘটনায়। ১৭ অক্টোবর বিক্ষোভ চলাকালে একদল লোক জোর করে সিটি হলে ঢুকে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরদিন মার্সেইয়ের রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল ধ্বংসাবশেষ।
পেতি তার বার্তায় দাঙ্গাকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এরা গুন্ডা, কারণ এদের ঐক্যবদ্ধ করেছে এদের কাপুরুষতা। এরা সবকিছু ধ্বংস করে, সবকিছু পোড়ায়, সবকিছু ভাঙে, লুট করে, চুরি করে, আঘাত করে, আক্রমণ করে, অপমান করে।’
তবে পেতি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের পক্ষেও কথা বলেছেন। তার ভাষায়, যারা গতকাল শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেছেন, তাদের সঙ্গে এই গুন্ডাদের গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। ‘আমি তাদের ভালোভাবেই বুঝি, কারণ করের চাপে লেবুর মতো চিপে যাওয়ায় আমিও অতিষ্ঠ,’ বলেন তিনি — ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, কর দেওয়া আর আইন মেনে চলা পরিশ্রমী পরিবারগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়ে।
অভিবাসন প্রশ্নেও কড়া অবস্থান নিয়েছেন সাবেক এই আর্সেনাল তারকা। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, আমি সব বিদেশিকে ভালোবাসি যারা আমার দেশকে ভালোবাসে এবং এখানে মিশে যেতে চায়।’ তবে যারা ফ্রান্সকে ঘৃণা করে, তাদের উদ্দেশে তার বার্তা: ‘তোমরা যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফিরে যাও, তোমাদের আমাদের দরকার নেই।’
ফরাসি পাসপোর্ট নিয়ে জন্মানো দেশীয় উগ্রপন্থী ও দাঙ্গাকারীদের প্রতিও একই কড়া বার্তা দিয়েছেন পেতি। তার ভাষায়, যারা জন্মসূত্রে ফরাসি হয়েও এই সহিংসতায় অংশ নিচ্ছে, তাদেরও আর চাওয়া হয় না।
ম্যাক্রোঁকেও ছাড় দেননি পেতি। রাজনৈতিক শ্রেণির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক শ্রেণিকে বলছি, শুরুটা আমাদের প্রিয় প্রেসিডেন্ট মি. ম্যাক্রোঁ থেকে। আপনারা কী করতে যাচ্ছেন, কী বলতে যাচ্ছেন এবং সৎ নাগরিকদের কীভাবে সুরক্ষা দেবেন — এ নিয়ে খুব সতর্ক থাকুন।’
সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করেন পেতি। তার কথায়, ‘আজ পুলিশের জন্য টাকা নেই, সেনাবাহিনীর জন্য টাকা নেই, হাসপাতালের জন্য টাকা নেই, স্কুলের জন্য টাকা নেই। অদ্ভুতভাবে, ফ্রান্সে একমাত্র যেটা ঠিকমতো কাজ করে, সেটা হলো কর।’
আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই অস্থিরতা ফ্রান্স সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্ধ মিলিয়নের বেশি মানুষের অংশ নেওয়া বিক্ষোভ দেখিয়ে দিচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনমনে ক্ষোভ কতটা গভীর। পেতির মতো জনপ্রিয় মুখ যখন প্রকাশ্যে সরকারকে সতর্ক করেন, তখন সেই চাপ আরও বাড়ে বই কমে না।






