বিমান ছিনতাইচেষ্টার নায়ক কে? ইসরায়েলি প্লাম্বারের দাবি নিয়ে সংশয়ে আহত ক্যাপ্টেন
ফ্লাইদুবাইয়ের উড্ডয়নরত বিমান ছিনতাই ও বিধ্বস্ত করার চেষ্টা নস্যাৎ করার ঘটনায় ইসরায়েলি প্লাম্বার ইয়ানিভ হায়ুনের দাবিকৃত ভূমিকা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন বিমানটির মূল পাইলট বা ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। আবু ধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতীয় নাগরিক এই ক্যাপ্টেন সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন—একজন প্লাম্বার কি আসলেই উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে পারেন?
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানে ছিলেন ১৭২ জন যাত্রী। অভিযোগ রয়েছে, ওমানি বংশোদ্ভূত সহ-পাইলট হামাম আল-হামমামি (২৯) ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের ওপর কুঠার দিয়ে একাধিকবার আঘাত করেন এবং বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালান। সেই ভয়ংকর মুহূর্তে মাত্র ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি ১৪ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের বিপর্যায় এড়ানো সম্ভব হয় এবং যাত্রীদের প্রাণ বেঁচে যায়।
ঘটনার পর নিজের ভূমিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইয়ানিভ হায়ুন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, তিনি হামলাকারীকে জাপটে ধরে গলা চেপে কাবু করেন এবং টেনেহিঁচড়ে ককপিট থেকে বাইরে বের করে আনেন। এমনকি টেলিভিশন সিরিজ ‘এয়ার ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন’ দেখে বিমান নিয়ন্ত্রণের কৌশল শিখেছিলেন বলেও দাবি করেন এই প্লাম্বার, যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে ‘দ্য ন্যাশনাল’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যাপ্টেন মাচ্ছার হায়ুনের এই দাবির বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেছেন। হায়ুন দাবি করেছিলেন, তিনি ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং বিমান অবতরণে সহায়তা করেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন বলেন, এমন কোনো ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে নেই। তাঁর ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, ওই প্লাম্বারের গল্পের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’
ক্যাপ্টেন মাচ্ছার আরও বলেন, ‘একজন প্লাম্বার কি বিমান অবতরণ করাতে পারেন? আমি কোনো অনুমাননির্ভর আলোচনায় যেতে চাই না। তবে আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি, সেই মুহূর্তে আমার স্মৃতি ও সমস্ত শক্তি কেবল নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কাজেই নিয়োজিত ছিল।’ তাঁর এই বক্তব্য হায়ুনের বীরত্বগাথা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আবু ধাবির হাসপাতালে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের মাথা ও বাম হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। তিনি জানান, ওই পরিস্থিতিতে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা। ফ্লাইটের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী তাঁকে বলেছিলেন, ক্যাপ্টেনই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ করছেন—এ কথা তাঁর মনে আছে বলেও জানান তিনি।
সেদিনের ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে মাচ্ছার বলেন, প্রথম আঘাত পাওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, বিমানের কাঠামোয় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সহ-পাইলটই তাঁকে আক্রমণ করেছেন এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘তখন আমার প্রথম চিন্তা ছিল যেভাবেই হোক সাহায্য আনতে হবে। আমি দ্রুত সিট বেল্ট খুলে নিজেকে মুক্ত করি এবং যথাসম্ভব আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করি। নিজেকে রক্ষা করতে হাতেও আঘাত লাগে।’ তাঁর ভাষ্য, আঘাতগুলো সরাসরি মাথায় করা হচ্ছিল, ফলে পরিস্থিতি ছিল প্রাণঘাতী।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, সহ-পাইলট হামাম আল-হামমামি বিমানটি ছিনতাই করে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে আছড়ে ফেলে আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ক্যাপ্টেনের হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
ঘটনার পর ২৯ বছর বয়সী ওই সহ-পাইলটকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তদন্তের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত এগিয়ে গেলে সেদিন ককপিটে আসলে কী ঘটেছিল এবং যাত্রী হায়ুনের ভূমিকা কতটা ছিল, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যেতে পারে।





