কিশোর গ্যাং ঠেকাতে সব উপজেলায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত, রাজধানীতে এক দিনে গ্রেপ্তার ৪৮৪
ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশের সব উপজেলায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার (১৯ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সদস্য-সচিব করে এসব কমিটি গঠন করা হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত কাঠামো গড়তেই এই সিদ্ধান্ত। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা, কার্যপরিধি ও কাজ শুরুর সময়সীমা সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সিদ্ধান্তটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দেড় হাজারের বেশি কিশোর গ্রেপ্তার হয়েছে। এরপরও পাড়া-মহল্লায় তাদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে। কুমিল্লায় কয়েক দফার অভিযানে দুই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আটক করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযানে আটক ব্যক্তিদের সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য নন; বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাই গ্রেপ্তারের সামগ্রিক সংখ্যাকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিযানের পরও উদ্বেগের আরেকটি কারণ শিশু উন্নয়নকেন্দ্রগুলোর ওপর বাড়তি চাপ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের টঙ্গীতে ছেলেদের শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে ৩০০ আসনের বিপরীতে ৬৯৩ জন এবং যশোরের পুলেরহাট কেন্দ্রে ১৫০ আসনের বিপরীতে ৩০৩ জন অবস্থান করছে। এসব কেন্দ্রে কিশোরদের পরিচর্যা, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করলে সমস্যার শিকড় দূর হবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো এলাকায় রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গ্যাং গড়ে ওঠে। এসব দলের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি, বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব কিশোরদের অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দলবদ্ধ পরিচিতি, প্রভাব দেখানোর আকাঙ্ক্ষা এবং তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়ও তাদের আকৃষ্ট করে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধে জড়িত কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অপরাধে ব্যবহার করা প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে কিশোরদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, পরিবারভিত্তিক তদারকি, কাউন্সেলিং ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদার মতে, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কমিটিতে প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি সমাজসেবা বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
এদিকে রাজধানীতেও চলছে নিয়মিত অভিযান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে; এ সময় বিভিন্ন অপরাধে ৫৩টি মামলা হয়েছে। সোমবার সকালে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন এ তথ্য জানান।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে মিরপুর বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ জন রয়েছে। এছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ৭৬, মতিঝিল বিভাগে ৬৮, ওয়ারী বিভাগে ৫০, লালবাগ বিভাগে ৪১, রমনা বিভাগে ৩৭, উত্তরা বিভাগে ৩৫, গুলশান বিভাগে ১৮ জন, গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) ৭ জন এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগে ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযানের সময় ৫৬০ গ্রাম গাঁজা, ৪ হাজার ৩৭৩ পিস ইয়াবা, ৩ গ্রাম হেরোইন ও ২০৪ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ৯টি মোটরসাইকেল, ২৬টি মোবাইল ফোন, ৪০৫টি সিমকার্ড, একটি অটোরিকশা ও নগদ ১ হাজার ৫০৫ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় একজন ভিকটিমকেও উদ্ধার করা হয়।
সব মিলিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কমিটি গঠনই চূড়ান্ত সমাধান নয় — অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করা গেলেই এই উদ্যোগের সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কমিটিগুলোর কার্যপরিধি ও কাজ শুরুর সময়সীমা এখন দেখার বিষয়।




