যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার, ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ
২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশটির ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে কেবল করোনা মহামারির সময়, ২০২০ ও ২০২১ অর্থবছরে এর চেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে টানা ২৫ বছর ধরে বার্ষিক বাজেট ঘাটতিতেই রইল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি।
মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের তুলনায় এবার ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবছর শুরু হয় অক্টোবরে এবং শেষ হয় পরের বছরের সেপ্টেম্বরে; সেই হিসাবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে ২০২৬ অর্থবছর।
এই সময়ে মার্কিন সরকারের মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে এসেছে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বেতনভিত্তিক কর থেকে এসেছে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আয় ও ব্যয়ের এই ফারাকই ঠেলে দিয়েছে ঘাটতিকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে।
ব্যয়ের বড় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, মেডিকেয়ারে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, ঋণের নিট সুদ পরিশোধে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং প্রতিরক্ষা খাতে ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের খাতটি। বর্তমানে এটি কেন্দ্রীয় বাজেটের তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় জমে থাকা ঋণের বোঝা এখন সরকারের নিয়মিত খরচের ওপরই চাপ তৈরি করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজেট ঘাটতির এই চিত্র সামনে এল। উচ্চ সুদহার ও বিপুল ঋণের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি ভালো গতিতে চললেও মহামারি বা বড় ধরনের মন্দা ছাড়াই ঘাটতি ও ঋণ এভাবে বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক। সাধারণত যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকটের সময়ই এমন বড় ঘাটতি দেখা যায়; স্বাভাবিক সময়ে এই প্রবণতাকে তারা ঝুঁকির সংকেত হিসেবে দেখছেন।
বাজেট পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, আর্থিক নীতিতে পরিবর্তন আনতেই হবে। ‘কমিটি ফর আ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট’-এর মায়া ম্যাকগিনাস সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমেরিকার আর্থিক স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং এটি সামলাতে আমাদের এখনই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ম্যাকগিনাসের মতে, একবারে বাজেট উদ্বৃত্ত করা বা রাতারাতি সব ঋণ শোধ করে ফেলার মতো অবাস্তব লক্ষ্য না নিয়ে আইনপ্রণেতাদের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। ‘আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে আমাদের এমন কিছু বেছে নিতে হবে যা একই সঙ্গে কঠোর কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য,’ বলেন তিনি।
লক্ষ্য হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেছেন ঘাটতিকে জিডিপির ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা, যা বর্তমান মাত্রার প্রায় অর্ধেক। তাঁর মতে, তাতে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত স্থিতিশীল থাকবে। তবে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর আমাদের হাতে সময়ও খুব বেশি নেই।’
টানা ২৫ বছরের ঘাটতির ধারাবাহিকতা আর ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানো ঋণের পাহাড় মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার আভাস মিলছে। ট্রেজারির নতুন হিসাব সেই বিতর্কে নতুন জ্বালানি জোগাল।




