…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
জাতীয়

চলনবিলে দেশি মাছের আকাল, এক বছরে শুঁটকি উৎপাদন কমল প্রায় ৩৯ শতাংশ; অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা সিরাজগঞ্জের চলনবিলের দেশি মাছ ও ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প এখন কঠিন সংকটে। বিলে দেশি মাছের সরবরাহ তীব্রভাবে কমে যাওয়ায় শুঁটকির উৎপাদন এক বছরে প্রায় ৩৯ শতাংশ কমে গেছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক শুঁটকির চাতাল, আর বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, জেলে ও হাজারো শ্রমজীবী মানুষ।

একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্যে মুখর থাকত বিলপাড়ের শুঁটকি মহালগুলো। বাঁশের মাচায় সারি সারি মাছ শুকানোর দৃশ্য, শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা আর শুঁটকির ঘ্রাণে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত পুরো এলাকায়। সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই ম্লান; চলতি মৌসুমে মাছের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জ মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে মোট মাছ উৎপাদন হয় ৭৮ হাজার ৯৪৫ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলায় উৎপাদিত হয় ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৭৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই দুই উপজেলার ৬০টি শুঁটকিমহালে উৎপাদিত হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে — এক বছরে কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

উৎপাদন কমার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের শুঁটকির বাজারেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশের চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশ শুঁটকি এখন আমদানি হচ্ছে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে। অথচ চলনবিলের শুঁটকির দেশজুড়ে সুনাম রয়েছে, বিদেশেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে প্রতি মাসে ওই তিন দেশ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার টন শুঁটকি আমদানি হয়, আর আমদানি করা শুঁটকির কিছু অংশের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় চলনবিলের যেসব এলাকায় সারা বছর পানি থাকত, সেসব স্থানে এখন বর্ষা ছাড়া অন্য সময় পানি থাকে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ, বসতবাড়ি ও শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। বিষ প্রয়োগ করে মাছ চাষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও দেশি মাছ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তারা।

সম্প্রতি উল্লাপাড়ার আড়ুয়া পাঙ্গাসী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি চাতালে নারী-পুরুষ মিলে শুঁটকি তৈরির কাজে ব্যস্ত। বাঁশের মাচায় শুকানো হচ্ছে পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা ও টাকি মাছ। তবে আগের বছরের তুলনায় মাছের সরবরাহ কম থাকায় মহালগুলোতে কর্মচাঞ্চল্যও কম।

স্থানীয় চাতালমালিক জাকারিয়া জানান, এখন শুঁটকি উৎপাদনের ভরা মৌসুম, অথচ চলনবিলে মাছের তীব্র সংকট। বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে কাঁচা মাছ কিনে এনে শুঁটকি তৈরি করতে হচ্ছে, এতে খরচ বাড়ছে ও লাভ কমছে। তিনি বলেন, গত বছর তার চাতালে প্রায় ৩৫ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল; এবার ১০ থেকে ১৫ টন হবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। আগে স্থানীয় মাছ দিয়েই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা যেত, এখন মাছ সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

জাকারিয়ার মতে, দেশে এখনো বড় পরিসরে আধুনিক শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠেনি, সংরক্ষণেও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা ও সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দেওয়া গেলে এই শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই বাড়ানো সম্ভব।

শুঁটকিচাতালের ব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের কঠিন জীবনসংগ্রাম। নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১১ ঘণ্টা কাজ করে তিনি মজুরি পান মাত্র ২০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে; বিকল্প কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে শুঁটকিমহালেই শ্রম দিতে হচ্ছে। মহাল বন্ধ হলে এসব শ্রমিকের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।

তাড়াশের মান্নাননগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, মাছের সংকটে প্রায় ৫০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, এতে প্রায় ৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। তার ভাষ্য, মাছ না থাকায় অনেক মহাল চালু রাখা যাচ্ছে না; যেগুলো চলছে, সেখানেও প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচা মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, চলনবিলে শোল, বোয়াল, পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি ও বাইমসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ থেকে শুঁটকি তৈরি হয়। এই অঞ্চলের উন্নত মানের শুঁটকি আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১০ থেকে ১২টি দেশে রপ্তানি হয়; স্থানীয় উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ যায় বিদেশের বাজারে। মানের ভিত্তিতে শুঁটকিকে এ, বি ও সি — এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়; এ গ্রেড মূলত রপ্তানির জন্য, বি ও সি গ্রেড বিক্রি হয় ঢাকা, সৈয়দপুর, তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশে পৌঁছায়।

দামের দিক থেকেও ছবিটা স্বস্তির নয়। প্রজাতি, আকার ও মান অনুযায়ী ছোট মাছের শুঁটকি প্রতি মণ ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং বড় মাছের শুঁটকি ২২ হাজার থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবু কাঁচা মাছের সংকট, সংগ্রহ ও পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে অনেক জেলে মাছ ধরায় আগ্রহও হারাচ্ছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বলেন, একসময় তার মহালে শুঁটকি তৈরির জায়গারই সংকুলান হতো না; অথচ এবার মাছের অভাবে মহালজুড়ে নীরবতা। তার অভিযোগ, প্রতিবছর এই খাত থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও শিল্পটির উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না; এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতেই শুঁটকি তৈরি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রথমেই চলনবিলের দেশি মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি উন্নত শুকানোর প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণাগার ও সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে; অবৈধ কারেন্ট ও দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধ, মাছের পোনা রক্ষা এবং প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, চলনবিলের শুঁটকির সুনাম ও চাহিদা দুটোই রয়েছে; দেশীয় মাছ সংরক্ষণ এবং শুঁটকির মান উন্নয়নে চাতালমালিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

চলনবিলের শুঁটকিশিল্প একদিকে দেশীয় ঐতিহ্য, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনাময় খাত। মাছের প্রাকৃতিক উৎস সংকুচিত হওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাব একে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরিকল্পনা, কার্যকর মৎস্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় ও প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ গড়ে তোলা না গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে — তাই এখন দরকার মহালমালিকদের সহায়তা থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও রপ্তানির মান নিশ্চিত করা পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

জাতীয়৪ মিনিটে পড়ুন

আট বছরের মোবাশিরার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ, গোলাপি ফিতার স্বপ্ন নিয়ে লড়ছে জামালপুরের শিশুটি

বয়স মাত্র আট বছর। এই বয়সে শিশুদের চোখে থাকার কথা দুষ্টুমির ঝিলিক, হাতে খেলনা, আর মাথায় শোভা পাওয়ার কথা রঙিন ফিতা। অথচ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের মোব…

জাতীয়১ মিনিটে পড়ুন

ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ২৬ অক্টোবর থেকে চলবে মহানগর এক্সপ্রেস

ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে চলবে মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন। রাজধানী থেকে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাতায়াতে ট্রেনযাত্রীদের জন্য …

জাতীয়৩ মিনিটে পড়ুন

বাউফলে বসতঘরে আগুন: বিয়ের জন্য ১০ বছরে জমানো ৭ লাখ টাকা পুড়ে ছাই, নিঃস্ব মোশাররফের পরিবার

পটুয়াখালীর বাউফলে বসতঘরে লাগা আগুনে এক নিমেষে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে একটি পরিবার। নিজের ও বোনের বিয়ের জন্য দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে জমানো প্রায় সাত লাখ…

জাতীয়৪ মিনিটে পড়ুন

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি এনসিপির

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ…