হরমুজ প্রণালিতে আটকা ৬ হাজার নাবিক, দুই সপ্তাহে হামলার শিকার ২৪ জাহাজ: জাতিসংঘ কর্মকর্তার সতর্কবার্তা
হরমুজ প্রণালির আশপাশে আটকা পড়েছেন প্রায় ৬ হাজার নাবিক, আর গত প্রায় দুই সপ্তাহে এই জলপথে হামলার শিকার হয়েছে ২৪টি জাহাজ। জাতিসংঘের শীর্ষ সামুদ্রিক কর্মকর্তা রবিবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন, এমন এক সময়ে যখন ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক জরুরি রেডিও চ্যানেল ব্যবহার করে বেসামরিক নাবিকদের হুমকি দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও দোমিঙ্গেজ বলেছেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর ও সংকটজনক রয়ে গেছে। তার ভাষায়, দ্বিমুখী অবরোধ চলছে এবং অনেক জাহাজে হামলা হয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে।
দোমিঙ্গেজ জানান, এসব হামলায় নাবিকদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে এবং সংঘাতের শুরু থেকে প্রায় ৬ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল না করা এবং নাবিকদের ঝুঁকিতে না ফেলাই তার বার্তা।
এই সতর্কবার্তার আগে ৯ অক্টোবর আইএমওর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান অভিযোগ করে, পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সামুদ্রিক বিপদ ও নিরাপত্তা চ্যানেল ভিএইচএফ চ্যানেল ১৬ দীর্ঘ সময় ধরে দখল করে রেখেছিল।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব সম্প্রচারের সময় ইরানি নাবিকদের ফারসি ভাষায় হুমকি, গালিগালাজ ও উসকানিমূলক ভাষায় সম্বোধন করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের জাহাজ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে।
তেহরান আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র সামুদ্রিক নিরাপত্তা চ্যানেলটিকে বেসামরিক নাবিকদের বিরুদ্ধে সামরিক ভীতি প্রদর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন আইএমওতে ইরানের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলী মুসাভি, এবং তা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
তবে চিঠিতে বাণিজ্যিক জাহাজ, জাহাজ কোম্পানি ও সামুদ্রিক অপারেটরদের কথা উল্লেখ থাকলেও অভিযোগের পক্ষে কোনো রেকর্ডিং, প্রতিলিপি বা সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানি বন্দরগুলোর নৌ অবরোধ কার্যকর করার অবস্থান রক্ষা করেছে। তাদের বক্তব্য, এই অবরোধ কয়েক মাস ধরে বহাল রয়েছে এবং সব আন্তর্জাতিক নাবিককে পেশাদারভাবে তা জানানো হয়। অবরোধ মানতে অস্বীকার করা জাহাজগুলোকে একাধিকবার সতর্ক করা হয় এবং মানার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়।
দোমিঙ্গেজ বলেছেন, নাবিকেরা যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত নন এবং বিশ্বজুড়ে চলমান কোনো সংঘাতের জন্য তারা দায়ীও নন। চ্যানেল ১৬ যে উদ্দেশ্যে তৈরি, তার বাইরে গিয়ে হুমকি হিসেবে মনে হতে পারে এমন বার্তা এই চ্যানেলে আসা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
আইএমওর হিসাব অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ১০০টি নিশ্চিত সামুদ্রিক ঘটনা ঘটেছে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ২৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। দোমিঙ্গেজ সতর্ক করেছেন, জাল জাহাজ নিবন্ধন ও ভুয়া পতাকার ব্যবহারও বিপদ বাড়ার বড় কারণ হয়ে উঠেছে; ঝুঁকি নিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য কিছু জাহাজ মালিক এসব ব্যবহার করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইরান আইএমওকে অনুরোধ করেছে, তাদের অভিযোগ সদস্য রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরতে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নও থাকতে পারে। দোমিঙ্গেজ বলেছেন, আইএমও তার বিধি ও পদ্ধতি পর্যালোচনা করে দেখতে পারে, আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা দরকার কি না; তবে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা দেননি।
এই মুখোমুখি অবস্থার মধ্যেও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দোমিঙ্গেজ, যদিও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ নেই। তার ভাষায়, তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, তবে চলমান সংঘাতের কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া কঠিন। আপাতত তার অবস্থান স্পষ্ট: কোনো একটি জাহাজে হামলা বা কোনো একজন নাবিকের প্রাণহানিও তার কাছে সংকটজনক পরিস্থিতি।






