নরসিংদীর জনবহুল এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় চিতাবিড়াল, টিকে আছে কীভাবে
জনবহুল জেলা নরসিংদীতে বিলুপ্তপ্রায় চিতাবিড়ালের বাচ্চার দেখা মিলেছে একাধিকবার—প্রথমে শিবপুরের সৃষ্টিগড় গ্রামে, পরে একই উপজেলার জামগড় গ্রামে তিনটি বাচ্চা পাওয়া গেছে। সুন্দরবন ও কিছু পাহাড়ি বনাঞ্চল ছাড়া দেশের আর কোথাও এদের অস্তিত্ব নেই বলেই জানা ছিল; সেই প্রাণী জনবহুল মধ্যাঞ্চলে কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ মার্চ। সকাল ১০টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো একটি সংবাদে জানা যায়, নরসিংদীর শিবপুরে চিতাবাঘের দেখা মিলেছে। এই সময়ে নরসিংদীর কোথাও চিতাবাঘের উপস্থিতি ছিল অকল্পনীয় বিষয়।
প্রথম ধারণা ছিল, হয়তো আবারও মেছোবিড়ালকে (ফিশিং ক্যাট) চিতাবাঘের বাচ্চা মনে করা হয়েছে—কারণ মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে মেছোবিড়াল ধরা পড়ে এবং মানুষ সেগুলোকে চিতাবাঘের বাচ্চা ভেবে বসে। কিন্তু সংবাদে ব্যবহৃত ছবিটি দেখে সেই ধারণা বদলে যায়; ছবির প্রাণীটি চিতাবাঘ, মেছোবিড়াল কিংবা বনবিড়ালের বাচ্চা—কোনোটিই নয়, অন্য কিছু।
এরপর ফোনে যোগাযোগ করা হয় বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক নিগার সুলতানার সঙ্গে। তিনি জানান, ঘটনাটি তাঁরা জানেন এবং বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বাচ্চাটিকে ধরা হয়েছিল শিবপুর থানার যশোর ইউনিয়নের সৃষ্টিগড় গ্রামে।
ঘণ্টা দুয়েক পর নিগার সুলতানা একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠান, যেখানে বাচ্চাটিকে মায়ের অবস্থানের কাছাকাছি অবমুক্ত করতে দেখা যায়। ভিডিওতে ছানাটিকে বেশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং তাতেই নিশ্চিত হওয়া যায়—এটি মেছোবিড়াল কিংবা বনবিড়ালের বাচ্চা নয়। স্থানীয় লোকজন চিতাবাঘের বাচ্চা মনে করে খুব একটা ভুল করেননি, যদিও সে চিতাবাঘের বাচ্চা নয়।
পরের ঘটনা গত ১৫ আগস্টের। সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিবপুরে তিনটি চিতাবাঘের বাচ্চা আটক হওয়ার ভিডিও প্রচারিত হচ্ছিল। খাঁচায় বন্দী বাচ্চাগুলোকে দেখে বিস্ময়ের সীমা ছিল না।
খোঁজখবর নিয়ে ঘটনাস্থল বের করা হয় শিবপুর থানার জয়নগর ইউনিয়নের জামগড় গ্রামে। সেদিন সকালে বাড়ির পাশের হলুদখেতে কাজ করতে গিয়ে মুরাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তি বাচ্চাগুলোকে দেখতে পান এবং ধরে বাড়িতে নিয়ে যান।
খাঁচাবন্দী বাচ্চাগুলোকে নিয়ে সেই হলুদখেতের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর পর সঙ্গের একজন ওদের মাকে দৌড়ে চলে যেতে দেখেন। তাতে বোঝা যায়, মা চিতাবিড়ালটি ছানাদের রেখে খুব বেশি দূরে যায়নি।
এরপর বাচ্চাগুলোকে খাঁচা থেকে বের করে হলুদখেতের পাশের একটি ঝোপের নিচে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওরা ডাকতে ডাকতে ঝোপের ভেতর চলে যায়। কিছুক্ষণ দূরে চুপচাপ অপেক্ষার পর একসময় ছানাদের ডাক থেমে যায়—ওরা মাকে খুঁজে পেয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে সৃষ্টিগড় ও জামগড় গ্রামে ধরা বাচ্চাদের সব ছবি ও ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয় খ্যাতনামা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান ও মনিরুল হাসান খানের কাছে। দুজনই নিশ্চিত করেন, এগুলো বিরল প্রজাতির চিতাবিড়ালের বাচ্চা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের মধ্যাঞ্চলের জনবহুল জেলা নরসিংদীতে কীভাবে এখনো চিতাবিড়াল টিকে আছে। বন্যপ্রাণীরা অনেক সময় বিরূপ পরিবেশেও নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে—এটি তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নরসিংদীর এই অঞ্চল মানুষের কাছে পাহাড়ি অঞ্চল নামে পরিচিত। অতীতে এখানে বহু জাতের বন্যপ্রাণীর বাস ছিল। তাদেরই শেষ সদস্য এই চিতাবিড়ালেরা এখনো এখানে টিকে আছে—যা খুবই আশা জাগানিয়া একটি ঘটনা।
তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রয়োজন। বন বিভাগকে এ সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এখন অপেক্ষা, তারা এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলোর সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষক, লেখক ও শিকারকাহিনি রচয়িতা সরওয়ার পাঠানের পর্যবেক্ষণ থেকেই উঠে এসেছে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ।





