রোগ ধরা পড়ার এক দশক আগেই রক্তে মিলতে পারে অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের সতর্কসংকেত, বলছে গবেষণা
অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা আইবিডি ধরা পড়ার অন্তত এক দশক আগেই মানুষের রক্তে তার সতর্কসংকেত দেখা যেতে পারে—নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের ভাষ্য, রক্তে থাকা অ্যান্টিবডির ধরন বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে, যাতে উপসর্গ তীব্র হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা যায়।
আইবিডির দুটি প্রধান ধরন হলো ক্রোনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিস। এই রোগে পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হয়। এখনকার চিকিৎসাব্যবস্থায় সাধারণত উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরই রোগটি শনাক্ত ও চিকিৎসা করা হয়—ততদিনে অন্ত্রের ক্ষতি অনেকটাই হয়ে যায়। নতুন গবেষণা বলছে, রোগের প্রক্রিয়া আসলে তার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়।
বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৮ লাখ মানুষ আইবিডি নিয়ে বসবাস করছেন। এই রোগে পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ও ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়। রোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি; তবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ আচরণ, বংশগত কারণ এবং অন্ত্রে বসবাসকারী জীবাণুর ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে প্রদাহরোধী ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী ওষুধ দিয়েই মূলত এই রোগের চিকিৎসা চলে। কিন্তু অনেক রোগী এসব ওষুধে সাড়া দেন না, আর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে অন্ত্রের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলতে হয়। দীর্ঘদিনের প্রদাহ অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়—এ কারণেই বিজ্ঞানীরা রোগের একেবারে শুরুর দিকের লক্ষণ খুঁজছিলেন।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার গ্রোনিংগেন ও নিউইয়র্কের আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সাইনাইয়ের ড. আর্নো বুরগোনিয়ে ও তাঁর সহকর্মীরা; সহযোগিতায় ছিল মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা। তাঁরা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংরক্ষিত রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেছেন।
মোট ৫০০ জনের ২ হাজার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে ২০০ জন পরে ক্রোনস ডিজিজে এবং ২০০ জন আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্ত হন; বাকি ১০০ জনের ক্ষেত্রে কোনো রোগই দেখা দেয়নি। নমুনাগুলোতে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, খাবার এমনকি শরীরের নিজের টিস্যুর লাখ লাখ প্রোটিনখণ্ডের বিরুদ্ধে তৈরি অ্যান্টিবডি খোঁজা হয়।
যাঁরা পরে ক্রোনস ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের রক্তে গ্রন্থিজ্বরের জন্য দায়ী এপস্টাইন-বার ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে—আর এই পার্থক্য রোগ নির্ণয়ের এক দশক আগের নমুনাতেই দেখা গেছে। যাঁদের রোগ পরে জটিল ও গুরুতর আকার নিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সংকেত ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী।
অন্যদিকে যাঁরা আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের বিন্যাস দেখা গেছে; এর মধ্যে শরীরের নিজেরই একটি প্রোটিনের বিরুদ্ধে তৈরি অ্যান্টিবডিও ছিল। অর্থাৎ দুই ধরনের রোগের ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আলাদা আলাদা ধরনের আগাম চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।
ড. বুরগোনিয়ে বলেন, অনেক দিন ধরেই অন্ত্রের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরই কেবল এই রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হতো, আর অনেকের জন্য সেটা ছিল অনেক দেরি। তাঁর ভাষ্য, এই গবেষণা দেখিয়েছে রোগটি উপসর্গ শুরুর বছরখানেক আগেই শুরু হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নির্ণয়ের অনেক আগে থেকেই সতর্কসংকেত পাঠায়। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি এখনো এমন কোনো পরীক্ষা নয় যা দিয়ে কেউ অসুস্থ হবেন কি না বলে দেওয়া যাবে; বরং রোগটি আগেভাগে ধরা এবং একদিন প্রতিরোধের পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘গাট’ সাময়িকীতে এবং উপস্থাপন করা হয়েছে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ইউনাইটেড ইউরোপিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সম্মেলনে। গবেষকেরা বলছেন, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা করে ফলটি যাচাই করা দরকার; আর পাওয়া সম্পর্কটি সংক্রমণই রোগের কারণ—এমনটা প্রমাণ করে না।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এমন বিশেষজ্ঞ বার্টস হেলথের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির অধ্যাপক জেমস লিন্ডসে বলেছেন, এই গবেষণা ক্রোনস ও আলসারেটিভ কোলাইটিসের কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে এবং ঝুঁকিতে থাকাদের শনাক্তে নতুন হাতিয়ার যোগ করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই কৌশল এখনো গবেষণাগারের পর্যায়েই আছে, চিকিৎসাকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়।
রোগীদের সংগঠন ক্রোনস অ্যান্ড কোলাইটিস ইউকের প্রধান নির্বাহী মারিয়ান র্যাডক্লিফ বলেছেন, আক্রান্তদের জন্য এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি; প্রতিটি নতুন ধারণা এই রোগ কীভাবে তৈরি হয়—উপসর্গের বছরখানেক আগে শরীরে কী কী পরিবর্তন ঘটে—তা আরও স্পষ্ট করে তুলছে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতোই রক্তপরীক্ষায় ঝুঁকি আগাম ধরা যাবে এবং উপসর্গ শুরুর আগেই চিকিৎসা দিয়ে রোগের সূত্রপাত বিলম্বিত করা সম্ভব হবে।




