রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
সর্বশেষ হালনাগাদ: সকাল ৬:৪৪
প্রচ্ছদ › শিক্ষা › খবর
শিক্ষা

চবিতে ২৪ বছর ধরে বিদেশি শিক্ষার্থী নেই, খালি পড়ে তিন হাজার আসন

নিজস্ব প্রতিবেদক • রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ • সকাল ১০:০৪ • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। প্রতিটি বিভাগে তাদের জন্য আসন বরাদ্দ রাখা হলেও বছরের পর বছর সেগুলো ফাঁকাই পড়ে আছে — গত দুই যুগে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ প্রায় তিন হাজার আসন শূন্য পড়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

একসময় এই ক্যাম্পাসে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। ১৯৮৭-৮৮ শিক্ষাবর্ষে চবিতে প্রথম বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন — নেপালের চারজন শিক্ষার্থী বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ওই ইনস্টিটিউটটিতে মোট ১৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন, এবং ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত চারজন নেপালি শিক্ষার্থী একই ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপর থেকেই ধারা ভেঙে যায়; আর কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীকে চবির ক্যাম্পাসে দেখা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চবিতে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না। প্রতি বছর প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে দুটি করে আসন বরাদ্দ থাকে, আর বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে বরাদ্দ পাঁচটি করে। সেই হিসাবে ২৪ বছরে বরাদ্দকৃত প্রায় তিন হাজার আসনই খালি রয়ে গেছে — এমন চিত্র দেশের কোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু কেন এই দীর্ঘ অনাগ্রহ? চবির শিক্ষকরা এর নেপথ্যে একাধিক কারণ দেখছেন। শিক্ষার মানের অবনতি, গবেষণার সীমিত সুযোগ, আবাসন-সংকট এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা — এসব মিলেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা চবিতে পড়তে আগ্রহী হচ্ছেন না বলে মনে করছেন তারা।

অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো এমন কিছু বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন অফার করতে পারছে না, যার জন্য তারা এখানে ভর্তি হতে আসবেন। তার মতে, অতীতের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিল — যেকোনো সংঘর্ষে তারা নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় থাকতেন। অ্যাকাডেমিক মানের অবনতি, আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং ডেডিকেটেড হল না থাকাকে তিনি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হবে গবেষণা। তারা ভর্তি হওয়ার আগে দেখবেন, এখানে গবেষণার মান কতটুকু আছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষকের অভাব এবং গতানুগতিক পাঠদান পদ্ধতির কারণেও বিদেশি শিক্ষার্থীরা অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসাইন জানান, একসময় এই ইনস্টিটিউটের অধিকাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন নেপালের। পরে তাদের দেশে এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হলে চবিতে নেপালি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যায়। আবাসন ও খাবারের সমস্যাকেও তিনি একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তুলনামূলক চিত্রও চবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৩৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী পড়ছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯১ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ জন এবং হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১২ জন রয়েছেন। অর্থাৎ, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থী টানতে পারলেও চবি পিছিয়ে পড়েছে।

এমন বাস্তবতায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, আমরা চাই বিদেশি শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসুক। তার ভাষায়, বিগত ১৭ বছরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না — এমনকি দেশের শিক্ষার্থীদেরও তারা ঠিকভাবে পড়াতে পারেননি।

পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে উপাচার্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রকল্পে একটি ইন্টারন্যাশনাল হল বা ডরমিটরির প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই হলে ১৫০ জন বিদেশি ছাত্র, ১০০ জন ছাত্রী এবং ৫০ জন বিদেশি শিক্ষক থাকতে পারবেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের আউটকাম বেসড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম চালু করা হয়েছে, অ্যাকাডেমিক সিলেবাসের মানোন্নয়ন করা হয়েছে এবং এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উপাচার্য আরও বলেন, প্রশাসনের দায়িত্বে তারা এসেছেন মাত্র কয়েক মাস হয়েছে, এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে তাদের আরও পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো-পরিকল্পনার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতা ও গবেষণা-পরিবেশ ফেরাতে না পারলে শুধু হল বানিয়েই বিদেশি শিক্ষার্থী ফেরানো কঠিন হবে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের ঘোষিত উদ্যোগগুলো কতটা দ্রুত মাঠে নামে — আর কবে ফের চবির ক্লাসরুমে বসবেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা।