গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ব্যাখ্যা দিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, বললেন হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষা
ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে গিয়ে অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, গাড়িবহরের দিকে একদল লোক মারমুখী ভঙ্গিতে ধেয়ে এলে হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন, এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই অস্ত্র যথাস্থানে রেখে দেওয়া হয়।
রোববার প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তারের পাঠানো এক বিবৃতিতে এই ব্যাখ্যা জানানো হয়। বিবৃতি অনুযায়ী, গত শনিবার গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় কর্মসূচি চলার সময় একটি অস্থায়ী আস্তানার কাছে ৩০ থেকে ৩৫ জন আইনলঙ্ঘনকারী ব্যক্তি তাঁদের দিকে এগিয়ে আসেন। জানমালের নিরাপত্তার কথা ভেবেই গাড়ি থেকে নেমে অস্ত্র তুলে ধরা হয় বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেওয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং তা প্রদর্শন করা হয়েছিল শুধু আত্মরক্ষার স্বার্থে। অর্থাৎ তাঁর ভাষ্যে, এটি কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ছিল না, ছিল আকস্মিক হুমকির মুখে নেওয়া প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া।
বিবৃতিতে ঘটনার আগের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা-৬ আসনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলাসহ আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি ধারাবাহিক অভিযোগ পেয়ে আসছিলেন বলে জানানো হয়।
আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এলাকাটি মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। গত জুনে মাদক-সংক্রান্ত সহিংসতায় তিনজন নিরীহ নাগরিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করেন।
মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় আধা সরকারি চিঠি দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্থায়ী পুলিশি উপস্থিতির দাবি আগেই তোলা হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
ইশরাক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তেই সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশগ্রহণে সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি ওই এলাকায় যান। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়।
পরে পুলিশের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সহায়তায় সন্দেহভাজন মাদকের আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়। বিবৃতির দাবি, এ সময় চার থেকে পাঁচটি অবৈধ ও অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয় এবং সেখান থেকে হেরোইন বা হেরোইনজাতীয় মাদকদ্রব্য, বিদেশি মদ, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, বেশ কিছু দেশীয় ধারালো অস্ত্র, মাদক বিক্রির নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জন মাদক কারবারিকে আটক করে জব্দ করা আলামতসহ গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই উদ্ধার ও আটকের বিষয়গুলোকেই অভিযানের মূল ফলাফল হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, ফটোকার্ড ও খণ্ডিত শিরোনাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য প্রচার করায় সামগ্রিক প্রেক্ষাপট সামনে আসেনি, ফলে তাঁর ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সমালোচনা করে বলা হয়, সেসব প্রতিবেদনে অভিযানের সাফল্য, পুলিশের ভূমিকা, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং ছয়জনকে আটকের বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযান’ ধরনের খণ্ডিত দৃশ্যকে চটকদার শিরোনামে প্রচার করা স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করে তিনি সংবাদের সত্যতা যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটসহ প্রকাশের আহ্বান জানান।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে ইশরাক হোসেন বলেন, মাদকের আস্তানা পুরোপুরি উপড়ে ফেলা এবং ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করা জনগণের কাছে তাঁর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। কোনো ঘটনাকে খণ্ডিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শেষে তিনি জানান, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। ফলে ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নটি রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই — একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন আইন ও প্রোটোকলের সীমার মধ্যে ছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলবে; তবে তাঁর দপ্তরের অবস্থান এখন লিখিতভাবে পরিষ্কার: এটি ছিল হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষা, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রে, অল্প সময়ের জন্য।


