গরু, স্যামন ও ডিমকে পেছনে ফেলে প্রোটিনের তালিকায় শীর্ষে টোফু
প্রোটিনের উৎস বললেই যেসব খাবারের কথা সবার আগে মনে আসে — স্টেক, স্যামন কিংবা ডিম — নতুন এক বিশ্লেষণে সেগুলোর কোনোটিই শীর্ষে ওঠেনি। ২০টি প্রোটিন উৎসের মূল্যায়নে সবার ওপরে উঠে এসেছে প্রতিদিনের পরিচিত খাবার টোফু, যা অনেক ক্রেতাই হয়তো এতদিন উপেক্ষা করে এসেছেন। ‘বিপিআই স্কোর’ নামের এই মূল্যায়নে টোফু পেয়েছে ৪০ পয়েন্টের মধ্যে ৩৬ পয়েন্ট। তালিকার শীর্ষ চারে টোফুর পরই আছে শিমজাতীয় খাবার, চিয়া বীজ ও কিনোয়া। অন্যদিকে মোজারেলা, ভেড়ার মাংস, গরুর মাংস ও চেডার পনির ঠাঁই পেয়েছে সবচেয়ে নিচের সারিতে।
বিপিআই স্কোরটি প্রকাশিত হয় গত জুলাইয়ে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস ম্যাকডোনাল্ড ও বেটার প্রোটিন ইনস্টিটিউট (বিপিআই) মিলে তৈরি এই স্কোর ২০টি প্রোটিন উৎসকে ৪০ পয়েন্টের স্কেলে মাপে — যেখানে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয় পুষ্টি, সাশ্রয়ী মূল্য ও সহজলভ্যতা এবং পরিবেশগত প্রভাব।
স্কোরটির দুটি অংশ আছে। ‘পিপল স্কোরে’ দেখা হয় সোডিয়াম, সম্পৃক্ত চর্বি, কোলেস্টেরল, খাবারটিতে নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের সবগুলো আছে কি না, দাম ও সহজলভ্যতা। আর ‘প্ল্যানেট স্কোরে’ বিবেচনায় আসে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, পানি দূষণ, ভূমি ব্যবহার ও স্বাদুপানির ব্যবহার। টোফু দুই বিভাগেই সর্বোচ্চ স্কোর পেয়েছে।
পরিবেশগত তুলনাটি চোখে পড়ার মতো। গবেষণাপত্রের হিসাব অনুযায়ী, টোফু থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ মাত্র ০ দশমিক ৬১ কিলোগ্রাম, যেখানে গরুর মাংসের ক্ষেত্রে তা ৬৪ দশমিক ১৯ কিলোগ্রাম। ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ফারাক বিশাল — একই পরিমাণ প্রোটিনের জন্য টোফুতে লাগে প্রায় ২ বর্গমিটার জমি, গরুর মাংসে লাগে প্রায় ২১১ বর্গমিটার।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই র্যাংকিংকে চূড়ান্ত নির্দেশিকা হিসেবে নেওয়া যাবে না। এটি একজন গবেষকের তৈরি প্রাথমিক স্কোরিং পদ্ধতি, কোনো নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা কিংবা খাদ্য নির্দেশিকা নয়। এতে যুক্তরাজ্যের মুদি বাজারের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্কোরটি সমান আকারের পরিবেশনের তুলনা করে না — তুলনা করা হয় প্রতিটি খাবার থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিন পেতে যতটা প্রয়োজন, সেই পরিমাণের ভিত্তিতে।
ম্যাকডোনাল্ড নিজেই গবেষণাপত্রে লিখেছেন, প্রথম সংস্করণের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও বলা যায়, এই স্কোর আরও সূক্ষ্ম আলোচনার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি দেয়। অর্থাৎ উদ্দেশ্য কোনো খাবারকে জয়ী ঘোষণা করা নয়, বরং প্রোটিন বাছাইয়ের আলোচনায় পুষ্টির পাশাপাশি দাম ও পরিবেশকেও হিসাবের মধ্যে আনা।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ফিটনেস ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এবং স্ট্রেংথ অ্যান্ড গ্রেস ফিটনেসের প্রতিষ্ঠাতা কোরি ম্যাথিউস বলেন, ভোক্তাদের প্রোটিনের মান, পরিবেশনের আকার এবং বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাওয়া সম্ভব কি না — তিনটিই বিবেচনা করা উচিত। তাঁর দেওয়া উদাহরণে, তিন আউন্স রান্না করা মুরগির বুকের মাংসে প্রোটিন থাকে প্রায় ২৬ গ্রাম, আধা কাপ শক্ত টোফুতে থাকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ গ্রাম (পণ্যভেদে), আর দুই টেবিল চামচ চিয়া বীজে মাত্র ৪ থেকে ৫ গ্রাম।
ম্যাথিউসের ভাষায়, এর মানে এই নয় যে চিয়া বীজ খারাপ খাবার। কিন্তু কারও লক্ষ্য যদি এক বেলার খাবারে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম প্রোটিন নেওয়া হয়, তাহলে শুধু চিয়া বীজের ওপর প্রধান উৎস হিসেবে ভরসা করা ঠিক হবে না। ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, মাছ ও চর্বিহীন মাংসের মতো প্রাণিজ প্রোটিন সাধারণত সম্পূর্ণ প্রোটিন দেয় এবং অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘন উৎস হয়। সয়াজাত খাবার টোফুও সম্পূর্ণ প্রোটিন, তবে যাঁরা উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের পরিবেশনের আকার ও মোট গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে বলে ম্যাথিউস মনে করেন।
ওরেগনভিত্তিক নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান ও দ্য বেটার নিউট্রিশন প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাশলে কফ বলেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনই আসল কথা। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অনেকেই টোফু ভালোভাবে হজম করতে পারেন না। তাই তাঁর পরামর্শ, মানুষের উচিত এমন প্রোটিন উৎস বেছে নেওয়া যা তারা উপভোগ করে এবং সহজে পেতে পারে। ফ্লোরিডার নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান পুষ্টিবিদ জেমি লি ম্যাকইনটায়ারও ভোক্তাদের সতর্ক করেছেন, শুধু ‘উচ্চ প্রোটিন’ লেবেল দেখেই কোনো খাবারকে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ম্যাথিউসের উপসংহারটি সহজ — কোনো র্যাংকিংকেই নিজের পুষ্টি-চিন্তার পুরোটা করতে দেবেন না। র্যাংকিংটি কী মাপছে তা বুঝুন, তারপর নিজের আসল লক্ষ্য অনুযায়ী খাবার বেছে নিন। টোফুর শীর্ষস্থান তাই একটি সূচনা মাত্র, চূড়ান্ত রায় নয়।

