‘নো কিংস’ বিক্ষোভে আয়োজকদের নিরপেক্ষতার নিয়ম মানলেন না অনেকেই, সরাসরি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে স্লোগান
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে আয়োজকদের বেঁধে দেওয়া নিরপেক্ষতার নিয়ম প্রকাশ্যেই অমান্য করেছেন অনেক অংশগ্রহণকারী। আয়োজক সংগঠনগুলো আগেই নির্দেশনা দিয়েছিল, কর্মসূচি হবে নির্দলীয় — কোনো প্রার্থীর পক্ষে স্লোগান, ‘ভোট ব্লু’ জাতীয় আহ্বান কিংবা দলীয় প্রচার চলবে না। কিন্তু ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়া থেকে হোয়াইট হাউসের সামনে পর্যন্ত মাঠের চিত্রে দেখা গেছে উল্টো রূপ: বিক্ষোভকারীরা সরাসরি ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং নিজেরাই স্বীকার করেছেন, এই কর্মসূচি পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্ট।
আলেকজান্দ্রিয়ার সাউথ ওয়াশিংটন স্ট্রিটে বিক্ষোভকারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে ২৬ বছর বয়সী পরিবেশ প্রকৌশলী নায়েলি ক্রুজ হার্নান্দেজের বার্তা ছিল একেবারে সোজা — ‘ভোট ব্লু’। তিনি বলেন, ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে হবে, হাউস ও সিনেটে জিততে হবে শুধু ভার্জিনিয়ায় নয়, সারা দেশে। পাশে ছিলেন তাঁর প্রেমিক ২৫ বছর বয়সী নোয়া শোয়ার্জট, কোলে তাঁদের ১৩ বছর বয়সী মাল্টিজ-পুডল কুকুর মেবেলিন।
জাতীয় আয়োজকদের নিরপেক্ষতার নিয়মের কথা তুললে হার্নান্দেজ স্পষ্ট বলেন, আয়োজকরা যা খুশি বলতে পারেন, তিনি ‘ভোট ব্লু’ই বলবেন। তাঁর যুক্তি — কেন সবাই এখানে জড়ো হয়েছেন, হাউসে কারা, সিনেটে কারা, প্রেসিডেন্ট কে? উত্তর তাঁর ভাষায়: লাল, রিপাবলিকান আর ট্রাম্প। তিনি মেবেলিনকে দেখিয়ে মজা করে এও বলেন, কুকুরটিও নাকি আলেকজান্দ্রিয়া ও আশপাশের এলাকার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ারকে ভোট দিতে বলছে।
আয়োজকদের এই নিরপেক্ষতার অবস্থানের পেছনে আইনি কারণ আছে। ‘নো কিংস’ কর্মসূচিতে অর্থায়নকারী অলাভজনক সংগঠনগুলোকে ফেডারেল আইন মেনে চলতে হয়, তাই জাতীয় সংগঠন ও এর নেতৃত্বে থাকা ইনডিভিজিবল লিখিত নির্দেশনায় ‘ভোট ব্লু’ বলা, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচিত করার আহ্বান, প্রার্থী সমর্থন কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা নিষিদ্ধ করেছিল। কর্মসূচির জন্য ‘করণীয়’ ও ‘বর্জনীয়’র তালিকাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ার এই কর্মসূচিটি ছিল আয়োজকদের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপিত একটি আনুষ্ঠানিক ‘নো কিংস’ ইভেন্ট, অনানুষ্ঠানিক কোনো জমায়েত নয়। সেখানে এক ব্যক্তি বহন করছিলেন ‘রিফিউজ ফ্যাসিজম’ নামের একটি উগ্র বাম গোষ্ঠীর প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ছিল ‘ট্রাম্পকে এখনই যেতে হবে’। আরেকজনের হাতে ছিল ট্রাম্পকে ডায়াপার পরা শিশুর রূপে উপহাস করা ফোলানো বেলুন। আরেকটি সাইনবোর্ডে ছিল ‘৮৬ ৪৭’ লেখা — সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার পর ফেডারেল প্রসিকিউটররা যেটিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এক নারী হাসিমুখে নাড়ছিলেন এমন প্ল্যাকার্ড, যাতে সরাসরি লেখা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দরকার একটি বড় নীল ঢেউ।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের পেছনে আছে প্রায় ৩০০ সংগঠন, যাদের সম্মিলিত বার্ষিক আয় প্রায় ২৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে আছে ডেমোক্র্যাট-ঘনিষ্ঠ অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠী, বড় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মুভঅন, আমেরিকান ফেডারেশন অব টিচার্স ও এসিএলইউর মতো অলাভজনক সংগঠন। এই পটভূমির কারণেই নিরপেক্ষতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
আলেকজান্দ্রিয়ার কর্মসূচির কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউসের কাছে এইচ স্ট্রিটে আরেকটি আনুষ্ঠানিক ইভেন্টে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারী নাদিন সেইলারের বক্তব্য ছিল আরও সরাসরি। নিজেকে ‘পেশাদার বিক্ষোভকারী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া সেইলার — যাঁর কথা ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি উল্লেখ করেছিলেন — কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ট্রাম্পের পক্ষের লোকজন এখানে নেই, তাই প্রতিরোধমূলক এই কর্মসূচি কখনোই নির্দলীয় হতে পারে না। সরাসরি প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল: হ্যাঁ, এটি পক্ষপাতদুষ্ট বিক্ষোভ। তাঁর ভাষায় অংশগ্রহণকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের বেআইনি নীতি প্রতিরোধ করছেন, আর এটি ‘যতটা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া সম্ভব, ঠিক ততটাই’।
অন্যদিকে আয়োজকপক্ষ তাদের অবস্থানে অনড়। ‘নো কিংস’-এর জাতীয় মুখপাত্র ইউনিস এপস্টাইন-অর্টিজ ফোনে বলেন, ‘নো কিংস’ একটি নির্দলীয়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যা লাখো আমেরিকানকে গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়াতে, স্বাধীনতা রক্ষা করতে ও কর্তৃত্ববাদ প্রত্যাখ্যান করতে একত্র করেছে। মেইন থেকে ওরেগন পর্যন্ত ইভেন্টগুলো স্পষ্টত পক্ষপাতদুষ্ট ছিল — এমন পর্যবেক্ষণ জানালে তিনি বলেন, অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা অনেক পক্ষপাতদুষ্ট ইভেন্ট ‘নো কিংস’-এর সঙ্গে যুক্ত নয় কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আয়োজিত নয়, অনেকে ‘নো কিংস’ নামটিকে একটি স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে আলেকজান্দ্রিয়ার ক্ষেত্রে ইভেন্টটি যে আনুষ্ঠানিক তালিকাতেই ছিল, তা এই ব্যাখ্যাকে জটিল করে তোলে।
আন্দোলনের নেতৃত্বের নিজেদের বক্তব্যেও দ্বৈত চিত্র দেখা গেছে। ১৫ অক্টোবরের এক লাইভস্ট্রিমে ইনডিভিজিবলের সহপ্রতিষ্ঠাতা এজরা লেভিন দুই দলের প্রার্থীদের তুলনা করে বলেন, তাদের প্রার্থীরা সারা দেশে বেশ ভালো, বিপক্ষের প্রার্থীরা সর্বত্রই খুবই বাজে। ৯ অক্টোবরের এক ওয়েবিনারে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে সরাসরি ডেমোক্র্যাট সমর্থন না জানিয়েও ট্রাম্পের সমালোচনা করা যায় — শ্রোতাদের ‘সূত্র মিলিয়ে নিতে’ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আবার ইনডিভিজিবলের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা লিয়া গ্রিনবার্গ ‘নো কিংস’কে বর্ণনা করেন একটি নির্দলীয় জোট হিসেবে, যেখানে সব রাজনৈতিক মতের মানুষকে স্বাগত জানানো হয়।
আইনগত দিক থেকে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিগত বিক্ষোভকারীর পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য মানেই আয়োজকরা নির্বাচনী আইন ভেঙেছেন — এমনটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ হয় না। করমুক্ত দাতব্য সংগঠনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আবার রাজনৈতিক অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা। তবু মাঠের বাস্তবতা হলো, উত্তর ভার্জিনিয়া থেকে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দ লুকানোর কোনো চেষ্টাই করেননি — কারও প্ল্যাকার্ডে প্রতিদিন ট্রাম্পকে আগের দিনের চেয়ে বেশি ঘৃণা করার কথা, কারওটায় ‘ভাঁড়ের জন্য কোনো মুকুট নয়’ জাতীয় স্লোগান।
শেষ পর্যন্ত সেইলারের এক লাইনের বর্ণনাই এই বিতর্কের সারকথা হয়ে দাঁড়িয়েছে — আয়োজকরা কাগজে যতই নিরপেক্ষতার কথা বলুন, মাঠের অনেক অংশগ্রহণকারীর কাছে এই বিক্ষোভ ছিল পুরোপুরি দলীয় লড়াইয়ের অংশ। সামনের নির্বাচনী মৌসুমে এই টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্যে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।



