সৌরবিদ্যুতে চার হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা, পুঁজিবাজার থেকে তুলবে ৪০০ কোটি
তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর অভিজ্ঞতার পর এবার সৌরবিদ্যুতে বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে কনফিডেন্স পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানটি ৪০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে, যার মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা তোলা হবে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে। বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে এই অর্থ তোলার প্রস্তাব বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে ১৮ অক্টোবর রোড শোর আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কনফিডেন্স গ্রুপের ব্যবসা শুরু ১৯৯১ সালে সিমেন্ট খাত দিয়ে। ধীরে ধীরে নানা খাতে ছড়িয়ে এখন গ্রুপটির মোট ২০টি কোম্পানিতে কাজ করেন প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মোট সম্পদ ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, আর পুরো গ্রুপের সম্পদ প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করছে ৯ বছর ধরে।
বগুড়ায় পাশাপাশি দুটি ১১৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার, রংপুরেও আছে একই সক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র। সরেজমিনে দেখা গেছে, কেন্দ্রগুলোর ক্যাম্পাস সাজানো সবুজে — নানা ফুল ও ফলের গাছ, বড় পুকুরে রুই-কাতলার চাষ, হাঁস-মুরগি-টার্কির আলাদা জায়গা, এমনকি অ্যাকুয়ারিয়ামে ছোট মাছও। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশকে এভাবে সাজিয়ে রাখার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানটি তাদের পরিচয়ের অংশ হিসেবেই তুলে ধরে। ৯ অক্টোবর বগুড়া ও ১০ অক্টোবর রংপুরের কেন্দ্র পরিদর্শনে এই চিত্র দেখা যায়।
বর্তমানে কনফিডেন্স পাওয়ারের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৯৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ৩৩৯ মেগাওয়াটই উত্তরবঙ্গে, বাকি ৫৪ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র আছে চট্টগ্রামে। তেলচালিত কেন্দ্রে সাফল্যের পর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতেই সৌরবিদ্যুতের এই বড় পরিকল্পনা বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বগুড়ার কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় পরিকল্পনার কথা জানান গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমরান করিম। তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের সংকট সহসা মিটবে না, তাই বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আরও অনেক দিন তরল জ্বালানিচালিত কেন্দ্রের ওপর ভরসা রাখতে হবে। তবে বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে, আর সেই 흐름ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই কনফিডেন্স পাওয়ার পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দরপত্রে অংশ নিয়ে তিনটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার। কক্সবাজার ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ২০০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বাগেরহাটের মোংলার প্রকল্পে যৌথ অংশীদার হিসেবে আছে বিদ্যুৎ খাতের আরেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান ডরিন পাওয়ার। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াটের আরেকটি সৌরকেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে কনফিডেন্স।
পুঁজিবাজার থেকে তোলা অর্থের ব্যবহারের খাতও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মোট অর্থের ৮৩ শতাংশ খরচ হবে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি কেনা ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে, ১৫ শতাংশ যাবে ঋণ পরিশোধে, আর বাকি ২ শতাংশ খরচ হবে আইপিও-সংশ্লিষ্ট খাতে। অর্থাৎ আইপিওর অর্থের সিংহভাগই সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়নে যাওয়ার কথা।
পরিদর্শনকালে আয়োজিত সেমিনারে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে একটি নিবন্ধ তুলে ধরেন ইমরান করিম। সেখানে বলা হয়, প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও কয়েক বছর ধরে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের অভাবে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াটের কেন্দ্র অলস বসে থাকে, রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়মিত বন্ধ থাকে আরও প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, জ্বালানির অভাবে তাও সব সময় চালানো যায় না।
ইমরান করিমের ভাষায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের মহাপরিকল্পনা থাকলেও গ্যাস সরবরাহ শিগগির বাড়বে না, তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেই ভরসা করতে হবে। সরকারও সেদিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে, আর সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর এই সুযোগই কাজে লাগাতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার। এর আগে মাত্র দুই বছরের মাথায় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আনা ও সাত বছর ধরে নিয়মিত সরবরাহের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সৌরবিদ্যুতেও প্রতিষ্ঠানটি সফল হবে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য আরও বড়। সৌরবিদ্যুতের নতুন দরপত্রেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার। বর্তমান ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতাকে ২০২৯ সালেই ১ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে, এরপর তা বাড়িয়ে ২ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়ার কথাও ভাবছে কোম্পানিটি। ব্যাটারিশিল্পেও তাদের বিনিয়োগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চলমান জ্বালানিসংকটের সমাধান হিসেবে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে — রোড শোতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা মেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।



