নিষেধাজ্ঞা থেকে বন্ধুত্ব: মিয়ানমারের জান্তা প্রধানের দিকেই ঝুঁকছে ট্রাম্প প্রশাসন
একসময় যিনি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বিচারের দাবি তুলেছিলেন, আজ সেই মার্কো রুবিওই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতাসীন জান্তা প্রধানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ খুলে দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি নাটকীয় মুখ ফেরানো।
২০১৭ সালে আরও ২০ জন মার্কিন সিনেটরের সঙ্গে স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে রুবিও রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত ‘জাতিগত নিধনের’ কঠোর ভাষায় নিন্দা করেন এবং ‘ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বতন বার্মিজ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞার’ আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, এসব নৃশংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
এরপর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অপরাধ কেবল বেড়েছে। তখন যাকে জাতিগত নিধন বলা হতো, এখন তা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের চোখে গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত। ২০২১ সালে অং সান সু চিকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠিয়ে তাঁর দলের নির্বাচিত বিজয় উল্টে দিলে দেশটিতে টিকে থাকা সামান্য গণতন্ত্রও মুছে যায়; পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় সামরিক বাহিনী।
এর পর থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ এখন সামরিক বাহিনী, প্রতিরোধ বাহিনী এবং নানা জাতিগত মিলিশিয়ার মধ্যে জটিল সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই সংঘাতে প্রায় ১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন, ৫০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের এখন জরুরি সহায়তা দরকার। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয় — এবং সম্পূর্ণই মানবসৃষ্ট।
চলতি বছরের শুরুতে মিয়ানমারে লোকদেখানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, আর মিন অং হ্লাইং — যে জেনারেল গণহত্যার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এবং রুবিওর সেই চিঠির অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন — হয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু রুবিও, যিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আর মনে করেন না যে মিন অং হ্লাইংয়ের বিচার হওয়া উচিত। বরং তিনি তাঁকে মিত্র বানাতে আগ্রহী। এই মাসে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা নীতি উল্টে দিয়ে মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। এখন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। এই পদক্ষেপ অন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে হতবাক করেছে — মনে হচ্ছে, তাদের কাউকেই আগাম সতর্ক করা হয়নি।
এই মোড় বদলের পেছনের কারণ হিসেবে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে দুর্লভ খনিজ (রেয়ার আর্থ) সম্পদের প্রতি ওয়াশিংটনের আগ্রহ। একসময় গণহত্যা ও সামরিক শাসনের নিন্দা করলেও এখন ট্রাম্প সেই সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচকরা বলছেন। গণতন্ত্রকর্মীদের কাছে এই পরিবর্তন এক বিপর্যয়।
এর পেছনে স্বভাবতই একজন ‘মাগা’ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে — এবার তিনি রজার স্টোন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র, যিনি ২০১৯ সালে কংগ্রেসে মিথ্যা বলা, সাক্ষীকে প্রভাবিত করা এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প শিবিরের কথিত যোগসাজশের তদন্তে বাধা দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন; ট্রাম্প তাঁর সাজা মওকুফ করায় তিনি কারাগার এড়ান।
গণতন্ত্রকর্মীদের আশঙ্কা, এই নীতি-বদল মিয়ানমারের ভেতরে প্রতিরোধকে দুর্বল করবে এবং জান্তাকে আন্তর্জাতিক বৈধতার স্বাদ দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক দশকের অবস্থান এক কলমের খোঁচায় বদলে যাওয়া তাই শুধু মিয়ানমারের প্রশ্ন নয় — ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
