স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় কলেজ শিক্ষক, রৌমারীতে ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে নিহত ৫
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে ঘিরেই আবর্তিত হতো কলেজ শিক্ষক শহিদুল ইসলামের জীবন। সেই স্ত্রী-সন্তানদের সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে এখন তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন; জ্ঞান ফিরলে ফের ডুকরে উঠছেন। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না তিনি। একই অবস্থা পল্লি চিকিৎসক কামরুজ্জামান বাদলের — স্ত্রীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনিও।
শনিবার দুপুরে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ট্রাক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের তালিকায় আছেন কলেজ শিক্ষক শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ও দুই সন্তান। উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের শিবেরডাঙি বাজারের কাছে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
ট্রাক অটোরিকশার ওপর উঠে যাওয়ায় শহিদুল ইসলামের স্ত্রী লিপি, ছেলে রিশাদ (১২) ও মেয়ে তুবা (৭) মারা যায়। প্রাণ হারান লিপির বোন শরিফা খাতুনও। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অটোরিকশা চালকও — সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা পাঁচ।
শরিফা খাতুন যাদুরচর ইউনিয়নের কর্তিমারী গ্রামের পল্লি চিকিৎসক কামরুজ্জামান বাদলের স্ত্রী। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন শরিফার মেয়ে কামরুন্নাহার বৃষ্টি (২৫)। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহত শরিফার দেবর বকুল মন্ডল জানান, তিন-চার দিন আগে শরিফা ও লিপি তাঁদের সন্তানদের নিয়ে ময়মনসিংহে ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানে তাঁদের একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে মা থাকেন।
শনিবার ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন তাঁরা। অটোরিকশাটি রৌমারীর শিবেরডাঙি বাজারের কাছে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ধানবাহী ট্রাক অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়।
এতে ঘটনাস্থলেই লিপি, শরিফা ও অটোরিকশা চালক নিহত হন। গুরুতর আহত বৃষ্টি, রিশাদ ও তুবাকে রৌমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক রিশাদ ও তুবাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত বৃষ্টিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বকুল মন্ডল বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর স্বজনদের হারিয়ে কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। সবাই শোকে কাতর। কীভাবে কী হয়ে গেলো!’
শহিদুল ইসলাম রৌমারী টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। কলেজটির অধ্যক্ষ হুমাউন কবির বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে আমরা শহিদুলের কাছে ছুটে যাই। তিনি হাসপাতালে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের লাশ দেখে ডুকরে ওঠেন। বারবার মূর্ছা যান। জ্ঞান ফিরে আসলে ফের ডুকরে কেঁদে উঠেন।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘তাঁর জীবন বলতে ওই স্ত্রী আর দুই সন্তান। ওরাই ছিল ওর অবলম্বন। তাদেরকে ঘিরেই তাঁর পৃথিবী, সকল আনন্দ। সকলকে হারিয়ে তিনি পাগলপ্রায়। আমরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।’
রবিবার সকাল ৮টায় শহিদুলের স্ত্রী-সন্তানদের জানাজা শেষে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে জানান অধ্যক্ষ।
রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওছার আলী বলেন, ‘ট্রাকের মালিক ও চালককে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
