মোবাইল নম্বর ব্লক করায় কলেজ প্রাঙ্গণে দুই ছাত্রীকে জুতাপেটা, তদন্ত কমিটি গঠন
মোবাইল নম্বর ব্লক করে রাখায় বরিশালের মুলাদী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে দুই ছাত্রীকে জুতাপেটার অভিযোগ উঠেছে এক সহপাঠীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দুই ছাত্রীকে ক্লাস থেকে ডেকে এনে কলেজের সামনে জুতাপেটা করেন সহপাঠী ও তাঁর সঙ্গে থাকা বহিরাগতরা। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনার বিচার দাবি করে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভুক্তভোগীরা কলেজের অধ্যক্ষ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজ অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন লিখিত অভিযোগের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী দুই ছাত্রীর সঙ্গে তাঁদের এক সহপাঠী ছাত্রীর বন্ধুত্ব ছিল। তাঁরা একসঙ্গে কলেজে যাতায়াত করতেন। কয়েক দিন আগে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জেরে ভুক্তভোগী দুই ছাত্রী ওই সহপাঠীর মোবাইল নম্বর ব্লক করে রাখেন।
অধ্যক্ষ জানান, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সহপাঠী বৃহস্পতিবার অন্য এক সহপাঠীর মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে ডেকে নেন। পরে ওই সহপাঠীর বড় বোনসহ কয়েকজন বহিরাগত তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষ বলেন, লিখিত অভিযোগে দুই ছাত্রী জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সহপাঠী এবং তাঁর সঙ্গে থাকা বহিরাগতরা তাঁদের চুল ধরে টানাটানি করেন। এ ছাড়া জুতা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। তাঁদের প্রাণনাশের হুমকির পাশাপাশি কলেজে আসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে হামলার ভিডিও কে বা কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজ চত্বরে ওই দুই ছাত্রীসহ পাঁচ-ছয়জন তরুণী বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত। এর একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। ভিডিওতে কয়েকজনকে দুই ছাত্রীর চুল ধরে টানতে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে তাঁদের জুতা দিয়ে বেদম মারধর করার দৃশ্যও স্পষ্ট।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মোবাইলে নম্বর ব্লক করে রাখার জন্যই শুধু নয়, পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কলেজ অধ্যক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। তা না হলে তাঁদের কলেজে আসা-যাওয়া নিরাপদ বলে মনে করছেন না তাঁরা।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ছাত্রীর বোন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সেখানে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা ওই দুই ছাত্রীর জন্যই হয়েছে। তাঁরাই বাইরের লোকজন নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এ বিষয় নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তাঁরা হামলা চালালে প্রতিহত করতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটে। আর যারা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, তারা ওই ছাত্রীদের লোক বলেও দাবি করেন তিনি। তিনিও ঘটনার বিচার দাবি করে কলেজ অধ্যক্ষ ও ইউএনওর কাছে আবেদন করেছেন এবং সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
মুলাদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম সরওয়ার বলেন, ছাত্রীদের মধ্যে যে সমস্যা হয়েছে, তা সমাধানের দায়িত্ব কলেজের অধ্যক্ষকে দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারবেন। তাঁর জানামতে, কলেজে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ওই কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সুষ্ঠু সমাধান হবে।
মুলাদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন বলেন, কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ঘটনার সমাধান দেওয়া সম্ভব হবে। আর এ ধরনের ঘটনা কলেজে আর না ঘটে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে ছাত্রীদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে—সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





