সিজারিয়ান প্রসবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবিতে র্যালি
সিজারিয়ান বা সিসার প্রসবের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবিতে র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বন্ধ করে কেবল চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ভিত্তিতেই যেন সিজার করা হয় — এই দাবি তুলেছেন র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা।
বাংলাদেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত জরুরি প্রয়োজন না থাকলেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়। এতে মা ও নবজাতক দুজনেই বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন, পাশাপাশি পরিবারের ওপর চাপে বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, কোনো জনগোষ্ঠীতে মোট প্রসবের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সিজার হলেই মা ও শিশুর জীবন রক্ষার প্রয়োজন মেটে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই হার সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত গেলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে — তার বেশি হলে বাড়তি সিজার মা-শিশুর জন্য কল্যাণের বদলে ঝুঁকি ডেকে আনে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে সারা বিশ্বে প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। বিশ্বের ৪৫টির বেশি দেশে সিজারের হার সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে হলেও ৫০টির বেশি দেশে এই হার ২৭ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে — যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার এবং এর নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর মায়ের পুরোপুরি সেরে উঠতে প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ, শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা এবং বিরল ক্ষেত্রে অ্যামনিওটিক তরল মায়ের রক্তে মিশে যাওয়ার মতো জটিলতা।
আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, গর্ভধারণের ৩৯ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সিজার করা উচিত নয়। অথচ বাস্তবে অনেক সময় সুবিধাজনক সময় বেছে নেওয়া, প্রসব বেদনার ভয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপে আগেভাগেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিজার মা ও শিশুর জীবন বাঁচায়। গর্ভফুল দিয়ে জরায়ুমুখ ঢেকে থাকা, শিশুর উল্টো বা আড়াআড়ি অবস্থান, প্রসব দীর্ঘায়িত হওয়া, একলাম্পশিয়া কিংবা মা-শিশুর অবস্থার হঠাৎ অবনতি — এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে অস্ত্রোপচারই সঠিক সিদ্ধান্ত।
র্যালি থেকে দাবি উঠেছে, প্রতিটি সিজারের চিকিৎসাগত যৌক্তিকতা যেন নথিভুক্ত করা হয় এবং নিয়মিত নিরীক্ষার মাধ্যমে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি গর্ভবতী মা ও পরিবারকে স্বাভাবিক প্রসবের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করার কথাও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজারের হার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে একদিকে যেমন নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগ দরকার, তেমনি দরকার হাসপাতালগুলোতে দক্ষ ধাত্রী ও প্রসব-সহায়ক সেবার বিস্তার। মায়েরা যেন নিরাপদে স্বাভাবিক প্রসবের পরিবেশ পান, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।
র্যালির দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন দেখার বিষয়, সিজারিয়ান প্রসবের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।




